একজন বলআম বাউরার বিপথগামিতা ও শিক্ষা
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
বলআম বিন বাউরা ছিলেন মূসা (আ.) এর যুগের এক মহাজ্ঞানী ও প্রখ্যাত আলেম- যার দুআ কবুল হতো। পার্থিব লোভ ও রাজকীয় প্রলোভনে পড়ে তিনি মূসা (আ.) এর বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে গিয়ে ব্যর্থ হন এবং অভিশপ্ত হন । মহাগ্রন্থ কুরআনে তাকে কুকুরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। বলআম বাউরা দুনিয়াবী স্বার্থে নিজের অর্জনকে বিসর্জন দিয়েছিল এবং করুণ পরিণতি ভোগ করেছিল। মূসা (আ.) যখন আমালেক্বাদের বিরুদ্ধে জিহাদে যান, তখন আমালেক্বাদের রাজা ভয় পেয়ে বিশিষ্ট আলেম বলআম বিন বাউরাকে টাকার বিনিময়ে মূসা (আ.) এর বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে রাজি করায় । সে সম্পর্কে সূরা আরাফের ১৭৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ্ বলেন-
“তাদেরকে ঐ ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শুনাও, যাকে আমি দিয়েছিলাম নিদর্শন। অতঃপর সে উহাকে বর্জন করে, পরে শয়তান তার পেছনে লাগে, আর সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। আমি ইচ্ছা করলে এ দ্বারা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করতাম, কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ে ও তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। তার অবস্থা কুকুরের ন্যায়, উহার ওপর তুমি বোঝা চাপালে সে হাঁপাতে থাকে এবং তুমি বোঝা না চাপালেও হাঁপায়। যে সম্প্রদায় আমার নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের অবস্থাও এই রূপ, তুমি বৃত্তান্ত বিবৃত কর যাতে তারা চিন্তা করে” (আয়াত: ১৭৫-১৭৬)।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে-ফেরাউনের সলিল সমাধির পরের ঘটনা। নিজ ক্বওমের নেতাদের ক্রমাগত অবাধ্যতা, প্রতারণা এবং দ্বিচারিতার কারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একযোগে ধ্বংসের কারণে বিরক্ত হয়ে মূসা (আঃ) পবিত্র ভূমির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সংকল্প ত্যাগ করেছিলেন। মূসা (আ.)-এর প্রেরিত ১২ জন প্রতিনিধিকে ফেরত পাঠানোর পর মূসা (আ.)-এর অলৌকিকতা ও ফেরাউনের সেনাবাহিনী সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার কথা জানতে পেরে ফিলিস্তিন দখলকারী ‘জাব্বারীন’ বা আমালেকীয় গোত্রের শক্তিশালী নেতারা অস্থিরতায় ভূগছিল। তারা বাইতুল মুকাদ্দাসে মূসা (আ.)-এর অভিযান বন্ধ করার জন্য একটি কৌশলী উপায় খুঁজতে শুরু করেন। তারা গোপনে অনেক মূল্যবান উপহার সহ লোক পাঠান বালাম ইবনে বাউরা (بلعم بن باعوراء)-এর কাছে, যিনি সেই সময় বনু ইসরায়েলের একজন বিখ্যাত আলেম এবং পণ্ডিত ছিলেন। স্ত্রীর অনুরোধে তিনি সেই উপঢৌকন গ্রহণ করেন। তারপর তাকে আসল কথা বলা হয়-আমরা কীভাবে মূসার অভিযান বন্ধ করতে পারি। বলা হয় যে, বালাম ‘ইসমা’ই-আজম’-কে চিনত। সে যা-ই প্রার্থনা করুক না কেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে কবুল করা হয়েছিল। আমালেকীদের অনুরোধ ও পীড়াপীড়িতে অবশেষে সে মূসা আঃ এর বিরুদ্ধে প্রার্থনা করল। কিন্তু তার জিহ্বা থেকে বিপরীত প্রার্থনা বের হতে শুরু করে, যা আমালেকীদের বিরুদ্ধে যায়। তারপর সে প্রার্থনা বন্ধ করে দিল। কিন্তু সে তাদের আরেকটি শয়তানী পথ দেখাল। সে বলল, ‘যদি তারা ইসরায়েলের বংশধরদের মধ্যে ব্যভিচার ছড়ায়, তাহলে আল্লাহ তাদের উপর ক্রুদ্ধ হবেন এবং মূসার অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে।’
হযরত মূসা (আ.) এর বদ দোয়ায় বালআম ‘ইসমে আজম’ ভুলে গিয়েছিল এবং তার জবান তার বক্ষে লটকে পড়েছিল। অতএব, সে নিজের এই অবস্থা দেখে বলতে লাগল যে, আমার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে এখন আমিও তাদের বিরুদ্ধে ধোকা ও প্রতারণার মাধ্যমে কাজ করব। সে তার সম্প্রদায়কে নির্দেশ দেয় যে, ‘তোমরা নিজের নারীদেরকে খুব সাজিয়ে সুসজ্জিত করে, বনি ইসরাইলের সৈন্যবাহিনীর নিকট প্রেরণ কর এবং তার পূর্বেই তাদেরকে কিছু মালমাত্তা দিয়ে দাও এবং তাদেরকে বলে দাও যে, তোমরা সৈন্যবাহিনীর সাথেই অবস্থান করবে এবং ইসরাইলী বাহিনীর যে কোন সেনা তাদের সাথে কুকর্মে লিপ্ত হতে চায় তাকে বাধা দিতে পারবে না। সেনাদের এক ব্যক্তিও যদি কোন নারীর সাথে ‘যেনা’য় (ব্যাভিচারে) লিপ্ত হয়, তাহলে অন্যরাও তা দেখে এ জঘণ্য পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়বে।’
অতএব নারীরা যখন বনি ইসরাইলের সেনাবাহিনীতে পৌঁছে, তখন কেনআন গোত্রের এক মহিলাও তাদের মধ্যে ছিল। তার নাম ‘কাস্তি বিনতে সূর’। সে বনি ইসরাইলের এক বিরাট ধনী ব্যক্তির পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। এ ইসরাইলী ব্যক্তির নাম ‘জুমরী ইবনে শালুম’ এবং সে ছিল শামাউন ইবনে ইয়াকুবের বংশধর। লোকটি মহিলাকে দেখা মাত্র তার সামনে দাঁড়িয়ে তার গতিরোধ করে এবং তার রূপগুণে মুগ্ধ হয়ে তার হাত ধরে ফেলে এবং তাকে সঙ্গে নিয়ে হজরত মূসা (আ.) এর নিকট উপস্থিত হয় এবং বলতে লাগল, ‘আপনি অবশ্যই বলবেন যে, এই মহিলা আমার জন্য হারাম (অবৈধ)।’ তিনি বললেন, ‘অবশ্যই এ তোমার জন্য হারাম এবং এর সঙ্গে তুমি কিছুতেই মিলতে পার না।’ সে বলল, ‘এ ব্যাপারে আমি আপনার কথা কিছুতেই মানবো না।’ একথা বলেই সে মহিলাকে নিয়ে একটি গম্বুজে চলে যায় এবং সেখানে তার সাথে অবৈধকর্মে লিপ্ত হয়। এ পাপের পরিণতিতে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের ওপর ‘তাউন’ অর্থাৎ মহামারির আজাব রূপে নাজেল করেন।
হজরত মূসা (আ.) এর একজন নির্বাহী কর্মকর্তার নাম ফাখখাছ ইবনে আইজার ইবনে হারুন এ ঘটনার সময় অন্য স্থানে অবস্থান করছিলেন। দৈহিক দিক থেকে তিনি ছিলেন খুবই শক্তিশালী। তিনি প্রত্যাবর্তনের পর ‘তাউন’ মহামারি ও তার কারণ সম্পর্কে অবগত হন এবং তৎক্ষণাত সেই গম্বুজে চলে যান যেখানে জমরী ইবনে শালুম ও ঐ মহিলা পাপাচারে লিপ্ত ছিল। তিনি উভয়কে উলঙ্গ অবস্থায় হাতে নাতে ধরে ফেলেন। অতঃপর তার বাণে তাদেরকে বিদ্ধ করেন এবং বগল দাবা করে বাইরে নিয়ে আসেন। তাদেরকে আসমানের দিকে উঁচু করে ধরে আল্লাহর দরবারে এই বলে আরজ করতে থাকেন, ‘হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এই রূপ পাপ করে তাকে আমরা এমনি শাস্তি প্রদান করে থাকি।’ অতঃপর তাদেরকে হত্যা করেন এবং দোয়া করার পর সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইল হতে ‘তাউন’ উঠিয়ে নেন। বলা হয়, এ অপকর্মের সময় হতে ফাখখাছের দোয়া কবুল হওয়ার সময় পর্যন্ত (কারো কারো মতে এক ঘণ্টার মধ্যে) সত্তর হাজর লোক ‘তাউন’ মহামারিতে মারা যায়।
খোদাপ্রাপ্ত মানুষ কীভাবে খোদাদ্রোহী হয় এবং বিখ্যাত কীভাবে কুখ্যাত হয় তার অপূর্ব দৃষ্টান্ত ‘বালআম ইবনে বাউরা’। খোদার নৈকট্যলাভকারী প্রিয় বান্দা ‘ইসমে আজম’ এর অধিকারী হয়ে তা নবীর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে নিজের খোদাপ্রদত্ত অসাধারণ ক্ষমতার দাপট প্রদর্শন করতে গিয়ে ‘ইসমে আজম’ সহ সকল শক্তি-ক্ষমতা ও মর্যাদা সে হারিয়ে বসে এবং কুকুরের ন্যায় হাঁপাতে হাঁপাতে জিভ বার করে মৃত্যুর আগে সে যে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল তা তার দ্বীন দুনিয়া ধ্বংসের কারণ হওয়া ছাড়াও ডেকে আনা খোদায়ী আজাব ‘তাউন’ মহামারির শিকার হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিল সত্তর হাজার বনি ইসরাইল। বালআমের নসিব হয়েছিল কুত্তা মরার মতো ঘৃণিত লাঞ্ছণার মৃত্যু। মহান আল্লাহর নবী-রসূলগণের শানে যারা গোস্তাখী করে, যারা তাদের অবমাননা করে-সত্যের পক্ষালম্বন না করে যেসব আলেম দুনিয়ার লোভে মিথ্যার পক্ষে দুআ-তদবির করে ‘বালআম কাহিনী’তে তাদের জন্য রয়েছে শিক্ষা।