ইতিহাসে ব্যতিক্রমী জুলাই বিপ্লব: ঐক্যবদ্ধ জাতির সফলতার প্রথম সোপান

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

ইতিহাসে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন নতুন কিছু নয়। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব, ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সের ফরাসি বিপ্লব কিংবা ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামিক বিপ্লব ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সফলতম বিপ্লব। যার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসকের পতন হয়। এই বিপ্লবগুলো কালের সাক্ষী হয়ে স্বৈরাচারের নির্মম পতনের কথাগুলোকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশের মানুষও বিভিন্ন সময় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করেছে-১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন ও নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলন। এসব সফলতম আন্দোলনগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ছিল সংগঠণ, নেতৃত্ব, রূপায়ন, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনন্য বৈশিষ্ট্যে ব্যতিক্রম। প্রথমত যে বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের কথাগুলো বললাম, সবগুলোই ছিল কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির নেতৃত্বে। যেমন: রুশ বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিল লেনিনের বলশেভিক পার্টি, ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিল ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমিনী অথবা আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছিল বেগম খালেদা জিয়ার ইস্পাত কঠিন আপোষহীন নেতৃত্ব। শুরুতে এই আন্দোলন কোন রাজনৈতিক আন্দোলন ছিলনা-বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে চূড়ান্তরূপে রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে এবং অবশেষেসরকার পতনের ১দফা আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ৩৩০জন সংসদ সদস্যসহ পরিবার-পরিজন নিয়ে পালিয়ে যায়।

প্রথমতঃ জুলাই বিপ্লব বিশ্বের একমাত্র সফল বিপ্লব যার নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলের কোন শীর্ষ নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি বরং সম্পূর্ণ ছাত্র নেতৃত্বে গড়ে উঠা এই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট বিরোধী ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ও সফল হয়েছিল।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিল একদল অরাজনৈতিক তরুণ শিক্ষার্থী। বাংলাদেশ তথা পুরো পৃথিবীর ইতিহাসে শুধু একদল শিক্ষার্থীর নেতৃত্বে এত বড় বিপ্লব বিরল। যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছে তরুণরা। এখানে সত্যিই অবাক করার মতো, আন্দোলনের শুরু থেকে শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি দিচ্ছে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্যগত শিশুর মতো সে কর্মসূচিতে সংহতি এবং কিছু ক্ষেত্রে অংশগ্রহণও করেছে। এই বিপ্লব ইতিহাসে নতুন এক পথ তৈরি করল, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো গৌণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই এই বিপ্লবের পুরো কৃতিত্ব শিক্ষার্থী ও জনতার। যাদের উদ্দেশ্যও ছিল মহৎ। কেননা তারা শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বেরই পরিবর্তন চাননি। বরং তারা রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরকে ঢেলে সাজাতে হবে। শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই নয়, এই তরুণরা বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কথা বলছেন। যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারা ও সংস্কৃতির একটি বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা এখন সবার মুখে মুখে।

দ্বিতীয়তঃ এত অল্প দিনে কোন আন্দোলন সফল হয়নি, মাত্র ৩৬ দিবসের এই আন্দোলনে পৃথিবীর ইতিহাসে এত হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিসংখ্যান মতে ‘জুলাই বিপ্লবে শহিদের সংখ্যা ১৪২৩, আহত ২২ হাজার’ (দৈনিক যুগান্তর, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৪)। পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ হবার পূর্বে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দুনিয়ার ইতিহাসে এত অল্পসময়ে এত রক্তক্ষয়ী বিপ্লব আর দেখা যায়নি, যা এ বিপ্লবকে আর সব বিপ্লব থেকে ইতিহাসে ব্যতিক্রম হিসেবে স্থান দিয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ১৪ শতাধিক, এসব শহীদের ১২-১৩% ভুক্তভোগী শিশু। হাজার হাজার মানুষ স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পয়েন্ট-ব্ল‍্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি চালিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অনেকগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সংজ্ঞায় পড়ে, যা রোম স্ট্যাটিউটের ৭ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের সরাসরি হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালানো হয়েছে যা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয়। উক্ত প্রতিবেদনে কমপক্ষে সাতটি নিরাপত্তা বাহিনী সম্মিলিতভাবে এই দমন-পীড়নের সাথে জড়িত ছিল উল্লেখ করেছে। এদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই), ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই) এবং গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনকারী ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব কেবল ছাত্রদের প্রতিবাদ ছিল না, বরং এটি ছিল পুরো জাতির বিবেকের পুনর্জাগরণ ও জাতির গণজাগরণের একটি অমোঘ মূহুর্ত। এই গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী, ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী বাংলাদেশের।
তৃতীয়তঃ কোটা আন্দোলনের প্রথম থেকে শেষ অবধি পরিকল্পিত ছকে শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে গেছে ও আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব ঘাটতি পূরণে সক্ষম হয়েছে। তারা গণমানুষের আকাঙ্খা বুঝতে পেরেছিল, সাধারণ মানুষকে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছে, শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে এখানে সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব পেশার, সব লিঙ্গের মানুষের অন্তর্ভুক্তি এই বিপ্লবটিকে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নিজে না আসতে পারলেও সন্তানকে পাঠিয়েছে, কোথাও সন্তানসহ পিতা-মাতা এই আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেছে। বিশিষ্ট রাষ্ট্র চিন্তক বদরুদ্দীন ওমর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন-‘এত বড় গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশে আগে কখনো হয়নি। এই গণ-অভ্যুত্থান অল্প সময়ের মধ্যে শহর থেকে গ্রাম তথা সারা দেশে ছড়িয়ে গিয়েছিল। এই বিপ্লব ছিল জনক্ষোভের এক বহিঃপ্রকাশ। আর প্রত্যেকটা জনক্ষোভ থেকে এক একটা বিপ্লব হয়। ইতিহাসের প্রতিটা স্বৈরশাসকের পতন আমাদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নির্মম পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় গণতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরতন্ত্রের ভয়াবহ চর্চা হয় যা শেষ হয় জনবিপ্লবের মাধ্যমে। কিন্তু তার পরও প্রতিনিয়ত শাসকরা গণতান্ত্রিক হওয়ার থেকে স্বৈরতান্ত্রিক হওয়ার দিকেই অধিকতর নজর দেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা কার্ল মার্ক্স যথার্থই বলেছেন- এটাও ইতিহাসের শিক্ষা যে ইতিহাস থেকে কেউই শিক্ষাগ্রহণ করে না।’
চতুর্থতঃ পুরো সংসদ ও ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাবার ইতিহাসও বিরল। মধ্যযুগে বাংলার মুসলিম বিদ্বেষী রাজা গণেশের শাসনকাল ও পলায়নের ঘটনার সাথে দুর্নীতিপরায়ন ফ্যাসিস্ট হাসিনার পলায়নের সাদৃশ্য দেখা যায়। ১৬ বছরের দীর্ঘ শাসনামলে যেভাবে ইসলামপ্রিয় আলেম-উলামা, দেশের অভিভাবক বেগম খালেদা জিয়াসহ বিরোধী দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষের ওপর সীমাহীন জুলুম শেখ হাসিনা চালিয়েছে, ক্ষমতায় থাকার জন্য গুম, খুন ও আয়নাঘর স্ট্র্যাটেজি চালু করেছে, রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করেছে তাতে গণেশের মত পালানো ছাড়া কোন পথ খোলা ছিলনা।
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে ঘোষণাপত্র প্রণয়নের চেষ্টা চলছে। অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্ব ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করতে চেয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মতভিন্নতার কারণে সম্ভব হয়নি, একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল ঘোষণাপত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ছাত্রনেতাদের ডেকে জানিয়েছিলেন-ঐক্যের স্বার্থে সরকার অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব দলকে নিয়ে ঘোষণাপত্র তৈরি করবে।
গত ১৪ জানুয়ারি সরকার ঘোষণাপত্রের প্রথম খসড়া করে। তখন এর ওপর ৩২টি দলের মতামত গ্রহণ করা হয়। প্রাথমিক খসড়ায় বলা হয়েছিল- জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় দেশ গড়তে সংবিধানকে বাতিল বা সংশোধন করা হবে। তবে চূড়ান্ত খসড়ায় বলা হয়েছে, মানবিক ও নাগরিক অধিকার সমুন্নত রাখতে সংবিধান সংস্কার করা হবে। এতে সুষ্ঠু নির্বাচন, আওয়ামী লীগের গুম-খুন-দুর্নীতির বিচারের অঙ্গীকার রয়েছে। অভ্যুত্থানে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বীকৃতি রয়েছে। তবে ঘোষণাপত্রে কোন দল বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি।

ইতোমধ্যে বহুল আলোচিত জুলাই ঘোষণাপত্রের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র-জনতা, শিক্ষক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবী অনুযায়ী চলতি মাসের প্রথমার্ধে প্রাথমিক খসড়া তৈরি করে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেয়া হয়। চূড়ান্ত খসড়ার ওপর এখন মতামত নেওয়া হচ্ছে। সবার ঐক্যমতের ভিত্তিতে আগামী ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তিতে ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে। অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

প্রস্তাবিত খসড়া ঘোষণাপত্রে ২৭ দফা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে। প্রথম খসড়ায় বলা হয়েছিল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান হয়েছে। ঘোষণাপত্রে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন ও সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিএনপির দাবী অনুযায়ী পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব, ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকারের করা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশালের স্থলে বহুদলীয় গণতন্ত্রে পুণঃপ্রবর্তনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকারের করা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে পদদলিত করে ফ্যাসিস্ট সরকার সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ও মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস’ উঠিয়ে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দেশের আপামর মানুষের অন্তরে আঘাত দিয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি যদি তাঁর আদর্শভিত্তিক রাজনীতির সেই ধারা থেকে দিনে দিনে বিচ্যুত হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটি জনসমর্থন হারাতে বসেছে। রাজনীতিতে শূণ্য স্থান পূরণ হতে সময় লাগেনা। নীতি নির্ধারক ও শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বোধোদয় ঘটলে আর কোন ফ্যাসিস্টের উত্থান ঘটবেনা ও ছাত্র-জনতার আত্মাহুতি সার্থক হবে।
বিপ্লব শুধু ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছে-একথা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। বিপ্লব সীমাহীন দুর্নীতি-লুটপাট ও স্বজনপ্রীতি, গণতন্ত্রহীন নৈরাজ্য ও বাকশালের আদলে একদলীয় বন্দোবস্ত, ক্ষমতার অসহনীয় দাপট, অন্ধকার যুগের পুণঃপ্রতিষ্ঠা, স্বাধীন দেশকে অন্য দেশের শাসনের নিগড়ে বেঁধে দেওয়া ইত্যাদি বহুমুখী কারণে সংঘটিত হয়েছিল। এতে ছাত্র-জনতাসহ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনরত, দমন-পীড়নে নিষ্পেষিত রাজনৈতিক দলগুলোর
ভূমিকাকেও খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।
তবে বিপ্লব-পরবর্তী পরিবেশ-পরিস্থিতি আশানুরূপ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, বিপ্লবের পূর্ণতা এখনো বাকি। তাই এ বিপ্লবকে কেউ কেউ গণ-অভ্যুত্থান বলেই আপাতত তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অনভিজ্ঞ
নেতাদের মধ্যে কারও কারও অপরিপক্ক বক্তব্য ও সিদ্ধান্তের অপরিপূর্ণতা বিপ্লবকে বাধাগ্রস্ত করেছে। সেজন্যই বলতে হচ্ছে, বিপ্লব পূর্ণতা পায়নি। বিষয়টি দেশের স্বার্থে পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদরা আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতেন। প্রবীন নাগরিকবৃন্দ যারা এখনো বেঁচে আছেন তারা জানেন-স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে দেশের পুনর্বিন্যাস ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা সৃষ্টির সুযোগ আমাদের অদূরদর্শিতার কারণে বা দলীয় স্বার্থবাদিতার কারণে বা প্রতিহিংসা চরিতার্থের কারণে আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি। এটি আমাদের ব্যর্থতা। তাই তপ্পান্ন বছর দেশ উদ্দেশ্যহীনভাবে সংকীর্ণ গণ্ডিতে ঘুরপাক খেয়েছে। এবারও তেমনটি হলে সহজে আর এদেশ বাঞ্ছিত গতিপথে চলতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। বিপ্লবের রাজনীতিকিকরণ নয়, বিচ্ছিন্নতা নয়, ঐক্যবদ্ধ সমৃদ্ধ ও জাতি গঠণে বিপ্লবের অন্তর্নিহিত মর্মার্থ অনুযায়ী রাজনীতিকে সাজাতে হবে। তবেই শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক ও বিপ্লব সফল হবে।

আরো