তাহাজ্জুদ নামাজ: মু’মিনের শ্রেষ্ঠ ইবাদাত
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
তাহাজ্জুদের নামাজ সবচেয়ে বড় নফল ইবাদত যার মাধ্যমে আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করা যায় এবং আল্লাহর দরবারে শ্রেষ্ঠ হওয়ার মর্যাদা পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে উঠে তার স্ত্রীকে জাগাবে এবং দুজনে দুই রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করবে, আল্লাহর দরবারে তারা শ্রেষ্ঠ জিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।’
রাত্রি নিশিথে এই নামাজ আদায়ে সবচেয়ে বড় বাঁধা শয়তান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন ঘুমিয়ে যায় শয়তান তখন তার মাথার কাছে এসে বসে তিনটি গিঁট বাঁধে। প্রতিটি গিঁট বাঁধার সময় একটি কথা বলে. তোমার সামনে আছে দীর্ঘ রাত, তুমি ঘুমাও। যখন বান্দা ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর জিকির করে, তখন একটি গিঁট খুলে যায়। সবশেষে যখন সে নামাজ পড়ে, তখন শেষ গিটটি খুলে যায়।’
তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ে শয়তানের এই বাঁধা অতিক্রমে কয়েকটি পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে:
প্রথমত: ঘুমানোর আগে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার নিয়তে ঘুমানো। কোনো কারণে তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য ঘুম থেকে উঠতে না পারলেও সওয়াব পাওয়া যাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- *‘যে ব্যক্তি তার বিছানায় এল এবং যার নিয়ত ছিল রাতে উঠে নামাজ আদায় করা, কিন্তু তার ঘুম প্রবল হলো; তার নিয়ত অনুযায়ী তার জন্য পুরস্কার লেখা হবে এবং তার ঘুম আল্লাহর জন্য সাদাকাস্বরূপ।’*
দ্বিতীয়ত: অহেতুক কাজ থেকে বিরত থেকে ঠিক সময়ে দ্রুত ঘুমাতে হবে। দ্রুত ঘুমালে কিয়ামুল লাইল ও ফজরের শক্তি সঞ্চয় হয়।
তৃতীয়ত: তাহাজ্জুদের নামাজকে সহজভাবে নিতে হবে। ফজরের নামাজের ২৫-৩০ মিনিট আগে উঠে এই অভ্যাস রপ্ত করা যায়। এরপরে আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যায়।
হজরত আয়েশা (রা.) এর বরাতে পাওয়া একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- *‘তোমরা সেই পরিমাণ আমল করো যার সাধ্য তোমাদের রয়েছে।’*
চতুর্থত: ঘুমাতে যাওয়ার আগে ঘুমের আদবগুলো রক্ষা করা প্রয়োজন। যেমন অজুসহ ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুমের দোয়া পাঠ করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর একটি সুন্নত হলো রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দু হাতের তালুতে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক এবং সুরা নাস পাঠ করা। ঘুমাতে যাওয়ার আগে এসব সুন্নত পালন করা ভালো। এ ছাড়া আয়াতুল কুরসি এবং ঘুমের দোয়াগুলো পড়ে ঘুমকেও ইবাদতে পূর্ণ করা যায় ।
*ঘুম থেকে জাগার পর আমলসমূহ*
১) আল্লাহর প্রশংসা করা: রাসুল (সা.) ঘুম থেকে উঠেই আল্লাহর প্রশংসা করতেন। তিনি বলতেন: “আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বা’দা মা আমা-তানা, ও ইলাইহিন নুশুর।”
অর্থ: “সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের ঘুমের পর আবার জীবিত করলেন, আর তাঁরই দিকে হবে আমাদের প্রত্যাবর্তন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭১১)
২) মিসওয়াক করা
ঘুম থেকে জেগে রাসুল (সা.) প্রথমেই মিসওয়াক করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫)
৩) ওজু ও ফজরের প্রস্তুতি
এরপর নবীজি (সা.) ওজু করতেন এবং ফজরের নামাজের প্রস্তুতি নিতেন। ওজু করার সময় তিনি দোয়া ও জিকিরে মনোযোগী থাকতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৪)
৪) ফজরের নামাজ ও সকালবেলার জিকির
নবীজি (সা.) ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করতেন। এরপর সূর্য ওঠা পর্যন্ত মসজিদে বসে জিকির, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ায় সময় কাটাতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৭০)
তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করে, তারপর সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর জিকিরে বসে থাকে এবং পরে দুই রাকাআত নামাজ (ইশরাক) পড়ে, সে এক হজ ও এক ওমরার পূর্ণ সওয়াব পাবে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৮৬)
৫) সূর্য ওঠার পর ইশরাক নামাজ
সূর্য ওঠার প্রায় ১৫–২০ মিনিট পর নবীজি (সা.) দুই বা চার রাকাআত ইশরাক নামাজ আদায় করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭২০)
৬) হালকা আহার ও পরিবারে সময় দেওয়া*
নবীজি (সা.) সকাল বেলা অল্প খাবার খেতেন, অনেক সময় খেজুর ও পানি নিতেন। এরপর পরিবারকে উপদেশ দিতেন এবং সবার খোঁজখবর নিতেন। (আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৮)
৭) সকালবেলার দোয়া ও জিকির
রাসুল (সা.) প্রতিদিন সকালবেলা কিছু নির্দিষ্ট জিকির পড়তেন, যেমন:
“আসবাহনা ও আসবাহাল মুলকু লিল্লাহ।”
আয়াতুল কুরসি,
সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস — তিনবার করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সকালবেলার এই রুটিন কেবল ধর্মীয় নয়, বরং শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তিরও উৎস। ঘুম থেকে জাগা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, নামাজ, জিকির ও ইতিবাচক মানসিক প্রস্তুতি—সবকিছুই এক সফল ও বরকতময় দিনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
