পূর্বাচলের আমেরিকান সিটিতে ৪টি প্লট রয়েছে শহিদুলের

স্টাফ রিপোর্টার:(এনবিআর) এর সাবেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামের দুর্নীতির ফাইল যত উন্মোচিত হচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে সাধারণ মানুষের চোখ কপালে ওঠার মতো সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঢাকায় ৫৩টি ফ্ল্যাট, সাভারে আলিশান বাংলোবাড়ি, পূর্বাচলের আমেরিকান সিটিতে ৪টি প্লট, রাজউকের আবাসন প্রকল্পে শত বিঘা জমি ও বাণিজ্যিক প্লটসহ তার স্থাবর সম্পদের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, শহিদুল ইসলামের এই কান্ডে তার নিজ এলাকা বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের মানুষ চরমভাবে হতবাক। কারণ তিনি নিজের এলাকায় দৃশ্যমান কোনো সম্পদ বা জমিজমা ক্রয় করেননি। শুধুই বাবার নামে মোড়েলগঞ্জে মোশারফ হোসেন ডিগ্রি কলেজ করেছেন, যাতে এলাকার মানুষের চোখে তিনি একজন সমাজসেবক হিসেবে পরিচিতি পান এবং তার আসল চেহারা আড়ালে থাকে। নিজ এলাকার মানুষকে অন্ধকারে রেখে এবং সাধারণ মানুষের চোখ এড়াতেই তিনি সমস্ত অবৈধ উপার্জনের টাকা বিনিয়োগ করেছেন ঢাকা ও এর আশপাশের রাজকীয় সব মেগা প্রকল্পে।

নিজ এলাকা ছেড়ে ঢাকায় সম্পদের পাহাড়,
ফ্ল্যাটের অধিকাংশ ​স্ত্রী ও শ্যালকদের নামে,
পূর্বাচল, আমেরিকান সিটি, গাজীপুরে ও সাভারে শত বিঘা জমি।

এছাড়া, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মধ্যে জেসিএক্স টাওয়ারে ভেলোসিটি নামের একটি আইটি প্রতিষ্ঠান আছে যেটির কর্ণধার শহিদুল ইসলামের ছেলে হাসিন ফারহান। অভিযোগ আছে, নামসর্বস্ব ওই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন শহিদুল। ওই ভবনে থাকা জেসিএক্স গ্রুপের একজন উচ্চপদস্ত ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করলে তিনি বলেন, শহিদুল ইসলাম এখানে স্পেস কিনেছেন, তিনি আমাদের ক্লায়েন্ট। অনেক অভিযোগের বিষয়ে আমরা শুনেছি। সত্য-মিথ্যা বলতে পারছি না।

বসুন্ধরার জি ব্লকের ১৬ নম্বর রোডের ৭৯-৮০ বাড়িটি শহিদুল ইসলামের ও তার স্ত্রীর বিশাল অট্টালিকা নামে পরিচিত। ওই বাড়ির দারোয়ানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বাড়ির মালিককে তিনি জীবনে একবার দেখেছেন। তার একজন শ্যালক আসে মাঝে-মধ্যে। বাড়ি ভাড়াও সে-ই তোলে। এছাড়া তাদের একজন গাড়ি চালক ও কাজের লোকও আসে।

​অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিজস্ব ২০ ফ্ল্যাটের ১০তলা ভবন ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন নামী ও অভিজাত এলাকায় শহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে আরও ৩৩টি ফ্ল্যাটের সুনির্দিষ্ট সন্ধান মিলেছে। মিরপুর রূপনগর আরামবাগ আবাসিক এলাকায় স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে একটি বিশাল ছয়তলা ভবন রয়েছে, যেখানে থাকা ১০টি ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ত্রিশ কোটি টাকা। অন্যদিকে ইস্কাটন গার্ডেন রোডের অভিজাত গার্ডেনিয়া টাওয়ারে স্ত্রীর নামে চার কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে, যেখানে সাধারণত সরকারের উচ্চপদস্থ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বসবাস করেন। চতুর এই কর্মকর্তা আইনি জটিলতা ও দুদক থেকে বাঁচতে মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় প্রজেক্টে স্ত্রীর নামে নির্মিত অপর একটি ছয়তলা ভবন ও তার ২০টি ফ্ল্যাট কৌশলে নিজের চার শ্যালক কাজী মুক্তাদীর ইবনু মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান ও কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনানের নামে কাগজে-কলমে হস্তান্তর করে রেখেছেন। বর্তমানে নথিপত্রে শ্যালকরা মালিক হলেও এর প্রকৃত সুবিধাভোগী শহিদুল নিজেই। সব মিলিয়ে সহিদুল, তার স্ত্রী ও চার শ্যালকের নামে থাকা ৫৩টি ফ্ল্যাট এবং দুটি দোকানের বাজারমূল্য অন্তত একশত বাষট্টি কোটি টাকা।

​শুধু ফ্ল্যাটই নয়, ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারের মধুমতি মডেল টাউনে ৩৫ কাঠা জমির ওপর লাল ইটের তৈরি তার যে রাজকীয় সেঁজুতি নামক বাংলোবাড়ি রয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের কৌতুদ্ধলের শেষ নেই। মাঝেমাঝে কয়েকটি দামী গাড়ি এসে থামলেও ভবনের কেয়ারটেকার বা অন্য কেউ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন না। বাজারদর অনুযায়ী এই বাংলোবাড়ির শুধু জমির দামই আছে অন্তত দশ কোটি টাকা। এছাড়া মধুমতি মডেল টাউন প্রকল্পের ভেতরেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে শহিদুলের মালিকানায় রয়েছে আরও পাঁচটি বিশাল প্লট। প্রকল্পের প্রধান ফটক পেরিয়ে প্রথম সড়কের দ্বিতীয় প্লটটি ২০ কাঠার, যা বর্তমানে গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়া এবং এর মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। কয়েকশ গজ সামনে ব্রিজ লাগোয়া ১২০ কাঠার বিশাল প্লটে রয়েছে গরু, ছাগল ও ভেড়ার একটি বিশাল বাণিজ্যিক খামার, যার মূল্য প্রায় ত্রিশ কোটি টাকা। ওই প্লটের পাশে ৬০ কাঠার আরেকটি প্লট এক্সকাভেটরসহ ভারী যন্ত্রপাতির গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়া, যার মূল্য পনেরো কোটি টাকা। ব্রিজ পেরিয়ে ১০ কাঠার একটি প্লটের দাম তিন কোটি টাকার বেশি এবং প্রকল্পের শেষ প্রান্তে ডানদিকে ১১০ কাঠা জমির দাম কমপক্ষে বিশ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচটি প্লটে তার মোট জমির পরিমাণ ৩২০ কাঠা, যার সম্মিলিত বাজারমূল্য অন্তত নব্বই কোটি টাকা।

​রাজউকের পূর্বাচল ও ডুমনি মৌজায় সহিদুল দম্পতির আরও ছয়টি বড় জমির কাগজপত্র হস্তগত হয়েছে। এর মধ্যে ডুমনি মৌজায় পিংক সিটিতে ৩৩ শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। পূর্বাচলের আমেরিকান সিটিতে ৪টি প্লটের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে। এছাড়া, পূর্বাচল পাঁচ নম্বর সেক্টরের পিতলগঞ্জ মৌজায় সাড়ে ১৬ শতাংশ জমির দাম পনেরো কোটি টাকার বেশি। দিঘলিয়া মৌজায় ৩৩ শতাংশ জমির মূল্য অন্তত দুই কোটি টাকা এবং বাড়িয়াছনি মৌজায় সাত শতাংশ জমির মূল্য দশ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া স্ত্রী ফাহমিদার নামে পূর্বাচলের মুশুরীগ্রাম মৌজায় ১৭ শতাংশ জমির মূল্য দুই কোটি টাকার বেশি এবং কামতা মৌজায় সাত শতাংশ জমির মূল্য প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা। ঢাকার বাইরে গাজীপুরের কালিগঞ্জে পাড়াবর্থা মৌজায় সহিদুলের নামে আরও ১৫ শতাংশ জমির কাগজ পাওয়া গেছে, যার দাম কোটির টাকার ওপরে। এছাড়া ইস্টার্ন হাউজিংয়ের আগুন্দা মৌজায় ১৭ শতাংশের দুটি প্লটে প্লাস্টিক কারখানা ভাড়া দেওয়া রয়েছে যার মূল্য প্রায় বিশ কোটি টাকা এবং মিরপুর বেড়িবাঁধের গড়ানচটবাড়ি মৌজায় ৩৩ শতাংশ জমির দাম অন্তত ত্রিশ কোটি টাকা। শহিদুল ইসলাম কোন কোন বড় কোম্পানির কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নিয়েছিলেন এবং ভাই ও ছেলেদের নামে আর কোথায় গোপন সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

আরো