বিশেষ একটি বিশ্বস্ত গ্রুপ শহিদুলের বর্তমান গোপন আস্তানার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ: পুরাতন বা পেছনের তারিখ দেখিয়ে সমস্ত সম্পত্তির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আম-মোক্তারনামা নেয়া

পূর্বাচলের আমেরিকান সিটির আনুমানিক ১০৪ কাঠার মূল্যবান জমি বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু শহিদুলের

স্টাফ রিপোর্টার: হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ বিদেশে বসেই বিক্রি করে অর্থ পাচারের নয়া কৌশল হাতে নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য শহিদুল ইসলাম। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, রাজউকের পূর্বাচলের আমেরিকান সিটির আনুমানিক ১০৪ কাঠার মূল্যবান জমি বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। দেশ থেকে পালিয়ে বর্তমানে মালয়েশিয়ার একটি বিলাসবহুল হোটেলে সপরিবারে অবস্থান করছেন। সেখানে বসেই সম্পদ বিক্রির জন্য জালিয়াতির নতুন কৌশল হাতে নিয়েছেন। গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে, দেশে থাকা তার সমস্ত সিন্ডিকেট ও বিশ্বস্ত সহযোগীদের মাধ্যমে তিনি এই সম্পদগুলো দ্রুত বিক্রি করতে মাস্টারপ্ল্যান সাজিয়েছেন শহিদুল।

​পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশে শহিদুল ইসলামের যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির দীর্ঘদিনের অংশীদার এবং যারা এই বিপুল সম্পদ দেখভাল করেন, তাদের মধ্য থেকে বিশেষ একটি বিশ্বস্ত গ্রুপ শহিদুলের বর্তমান গোপন আস্তানার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছে। এই সহযোগীরা যাওয়ার সময় দেশেই তৈরি করে নিয়ে গেছে বিশেষ আইনি নথিপত্র, যার মূল লক্ষ্য হলো পুরাতন বা পেছনের কোনো তারিখ দেখিয়ে শহিদুলের কাছ থেকে সমস্ত সম্পত্তির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আম-মোক্তারনামা নিজেদের নামে লিখিয়ে নেওয়া। এই জালিয়াতির প্রধান উদ্দেশ্য হলো আইনি জটিলতা এড়ানো এবং আদালতের মাধ্যমে সম্পদ ক্রোক বা বাজেয়াপ্ত হওয়ার আগেই যেন তারা শহিদুলের হয়ে এই সম্পত্তিগুলোর বৈধ মালিক সেজে যত দ্রুত সম্ভব বিক্রি করে দিতে পারেন। যেহেতু শহিদুলের সম্পদের পরিমাণ অঢেল এবং এই বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি যেমন ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ি একসাথে উপযুক্ত ক্রেতা খুঁজে বিক্রি করতে বেশ দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন, তাই শহিদুল ইসলাম আপাতত অস্ট্রেলিয়া বা কানাডায় যাওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আপাতত এশিয়ারই কোনো একটি নিরাপদ দেশে অবস্থান করবেন, যাতে তার সম্পদ বিক্রির সহযোগী সিন্ডিকেট ও সম্ভাব্য বড় ক্রেতাদের সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি বা গোপনে সাক্ষাৎ করা সহজ হয়। এছাড়া এশিয়ার মধ্যে অবস্থান করলে সম্পদ বিক্রির শত শত কোটি টাকা অতি সহজে ও নিরাপদে পরিচিত আন্তর্জাতিক হুন্ডির চ্যানেলে পাচার করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে তার সহযোগী সিন্ডিকেট। তার পরবর্তী অবস্থান হতে পারে কম্বোডিয়া, লাওস বা এশিয়ার কাছাকাছি ইউরোপের মলদোভার মতো কোনো দেশ।

​এই নতুন জালিয়াতির তালিকায় আমেরিকান সিটির ১০৪ কাঠা জমি ছাড়াও যুক্ত রয়েছে তার পূর্বের সমস্ত দৃশ্যমান ও গোপন সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকে ১০০ কোটি টাকা মূল্যের ‘শেল কবিতা’ নামক ২০টি ফ্ল্যাটের পুরো ১০তলা ভবন এবং বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারের দুটি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট। এছাড়া শাহবাগ ও নিউমার্কেটের চার কোটি টাকার দোকান, মিরপুর আরামবাগ আবাসিক এলাকায় স্ত্রীর নামে থাকা ৩০ কোটি টাকার ভবন এবং চার শ্যালকের নামে কাগজে-কলমে হস্তান্তর করা ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ২০টি ফ্ল্যাটও এই আমমোক্তারনামা জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রির তালিকায় রয়েছে। সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের ৩৫ কাঠার রাজকীয় লাল ইটের বাংলোবাড়ি ‘সেঁজুতি’ এবং ৩২০ কাঠার পাঁচটি বিশাল বাণিজ্যিক প্লট ও খামার, যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা, সেগুলোও এই চক্রের মাধ্যমে নগদায়নের চেষ্টা চলছে। এমনকি রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্প, ডুমনি মৌজার পিংক সিটি, পিতলগঞ্জ, দিঘলিয়া, বাড়িয়াছনি ও গাজীপুরের কালিগঞ্জে থাকা শত বিঘা মূল্যবান জমিও এই পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে দেশের বড় বড় ডেভেলেপার কোম্পানির কাছে বিক্রি করে সেই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে এশিয়ায় শহিদুলের কাছে পাঠানোর ছক চূড়ান্ত করা হয়েছে। এনবিআরের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তার এমন আন্তর্জাতিক জালিয়াতি ও সম্পদ পাচারের নতুন কৌশল এখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরো