ব্যাংককের হোটেল কক্ষে বসেই শহিদুল ইসলাম মূলত ছক কষছেন। পর্ব ৭

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে শহিদুল আলিশান হোটেলে সপরিবার নিয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদে

​​স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক প্রভাবশালী সদস্য শহিদুল ইসলামের সপরিবারে দেশত্যাগের সম্পূর্ণ রুট ম্যাপ এবং নিখুঁত এভিয়েশন নথিপত্র এবার প্রামাণ্যভাবে অনুসন্ধানকারীদের হাতে চলে এসেছে। দেশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে তিনি কীভাবে সীমানা পার হয়েছেন, তার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রেকর্ড ফাইল থেকে। প্রাপ্ত নথিতে দেখা যায়, গত ২৫ মে থাই এয়ারওয়েজের বিখ্যাত ফ্লাইট টিজি ৩২২ বিমানে করে শহিদুল ইসলাম তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি এবং ছোট ছেলেকে নিয়ে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পাড়ি জমিয়েছেন। বিমানবন্দর সূত্র নিশ্চিত করেছে যে ওইদিন তার নির্ধারিত ফ্লাইটটি দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও অভ্যন্তরীণ কিছু প্রক্রিয়ার কারণে এক ঘণ্টা বিলম্বে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন করে। অথচ এই পলায়নের আগে এবং এখন পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে সর্বত্র প্রচার করে রেখেছেন যে তিনি গুরুতর অসুস্থ এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। মূলত তার এই পাতানো গল্পের কারণে তার ঘনিষ্ঠ কিছু বিশেষ সহযোগী ছাড়া এখন পর্যন্ত সরকারের সাধারণ বিভাগ এবং পরিচিত মহলের সবাই জানেন যে তিনি মালয়েশিয়াতেই অবস্থান করছেন। এই চতুর মিথ্যা প্রচারণাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বর্তমানে ব্যাংককের একটি অত্যন্ত আলিশান হোটেলে পরিবার নিয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও আয়েশি অবসর সময় কাটাচ্ছেন তিনি।

​ব্যাংককের হোটেল কক্ষে বসেই শহিদুল ইসলাম মূলত ছক কষছেন কীভাবে বাংলাদেশে গড়া তার হাজার কোটি টাকার বিশাল সাম্রাজ্য দ্রুত নগদায়ন করে সেই টাকা আন্তর্জাতিক হুন্ডির মাধ্যমে নিজের কাছে নেওয়া যায়। যেহেতু তার সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ দেশের একাধিক বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থা এখনো তার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো কঠোর অনুসন্ধান বা ক্রোকের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেনি, তাই তিনি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বেশ সতর্কতার সঙ্গে এবং ঠান্ডা মাথায় তার এই সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছেন। এই গোপন মিশনের অংশ হিসেবেই তিনি নিজের দুই ভাই সেলিম ও জাকির এবং চার শ্যালক কাজী মুক্তাদীর ইবনু মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান ও কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনানকে পুরাতন বা পেছনের তারিখ দেখিয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা দেওয়ার নথি চূড়ান্ত করেছেন। এই বিশ্বস্ত চক্রটিই বর্তমানে দেশের বাজারে তার সম্পদগুলো বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজছে, যার মূল তদারকি চলছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকের ১৬ নম্বর রোডের ৭৯-৮০ নম্বরের ‘শেল কবিতা’ নামক ২০ ফ্ল্যাটের নিজস্ব বহুতল ভবন থেকে।

​এই আন্তর্জাতিক সম্পদ পাচার ও জاলিয়াত সিন্ডিকেটের আওতায় রাজউকের পূর্বাচল সংলগ্ন আমেরিকান সিটিতে সরেজমিনে সন্ধান পাওয়া তার ১০৪ কাঠা মূল্যবান জমি রয়েছে, যার সত্যতা প্রকল্পের সাইট কর্মকর্তা মনির স্বীকার করেছেন এবং যেখানে আরও একশ’র বেশি এনবিআর কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ রয়েছে। এছাড়া এই বিক্রির তালিকায় যুক্ত রয়েছে গুলশান ও বনানীর একাধিক ভিআইপি প্লট ও ফ্ল্যাট, দেশের বিভিন্ন নামী কোম্পানিতে তার বেনামী ইনভেস্টমেন্ট, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি-ব্লকের আরও ৬টি প্লট, আই-ব্লকের বাণিজ্যিক ফ্লোর, এন-ব্লকের প্লট এবং জে-ব্লকের ২০ কাঠার একাধিক মূল্যবান বাণিজ্যিক প্লট। পাশাপাশি সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের ৩৫ কাঠার রাজকীয় বাংলোবাড়ি ‘সেঁজুতি’ এবং খামার ও গ্যারেজসহ সেখানকার ৩২০ কাঠার পাঁচটি বিশাল বাণিজ্যিক প্লট যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা, বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারের দুটি ফ্ল্যাট, শাহবাগ ও নিউমার্কেটের দোকান এবং মিরপুরে স্ত্রীর নামে থাকা ৩০ কোটি টাকার ভবনও রয়েছে এই তালিকায়। এমনকি বড় ছেলে হাসিন ফারহানের বসুন্ধরার জেসিএক্স টাওয়ারের ভেলোসিটি আইটি ফার্মের কোটি টাকার অফিস, যার পার্টনার তাহির হাসান সাংবাদিকদের ফোন নম্বর ব্ল্যাকলিস্টে রেখেছেন, সেই সম্পদসহ পূর্বাচল, ডুমনি, পিতলগঞ্জ ও গাজীপুরের শত বিঘা জমিও এই আমমোক্তারনামার মাধ্যমে দ্রুত নগদায়ন করে হুন্ডির মাধ্যমে ব্যাংককে পাচারের ছক চূড়ান্ত করা হয়েছে। গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে শহিদুলের এই ব্যাংকক যাত্রা ও নতুন কৌশল এখন দেশের রাজস্ব ও আইনি মহলে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

তবে আমাদের অনুসন্ধান চলছে আরো নতুন কিছু তথ্য নিয়ে হাজির হব আগামী পর্বে।

শহিদুল ইসলাম এর সম্পদ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন আমাদের দপ্তরে কিছু অভিযোগ এসেছে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।

আরো