ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ অব্যাহত, বন্ধ কয়েকশ’ হাইস্কুল

শিখন পদ্ধতিতে উন্নত পরিবেশ ও সুবিধা বাড়ানোর দাবিতে ফ্রান্সে গত সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। এর ফলে দেশজুড়ে শত শত স্কুলে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। আগামীকাল বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়ার প্রেক্ষাপটকে ঘিরে আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গেটের বাইরে আন্দোলন চললেও কিছু শিক্ষার্থী স্কুলে প্রবেশ করে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক অনুপস্থিতি, ক্লাসের অতিরিক্ত সময়সূচি, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা সহনশীল নয় এমন ভবনের বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ জানিয়ে শত শত স্কুলের প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে রাখে। মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকতে এই কিশোর বা তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনটি বড় আকার ধারণ করলো। এই আন্দোলনটিকে ঘিরে দেশটির চরম ডানপন্থিরা ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে।

সরকার শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ সমাধানের চেষ্টা করার পাশাপাশি অভিযোগ এনেছে যে, উগ্র-বামপন্থি কর্মীরা এই আন্দোলনকে কব্জা করে নিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, ফ্রান্সের ৩ হাজার ৭০০টি হাইস্কুল বা ‘লিসে’র মধ্যে সোমবার সকালে ৪০০টিরও বেশি স্কুল আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

‘পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই’

কর্তৃপক্ষ রোববার পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত প্যারিস অঞ্চলের ৪৬৮টি স্কুলের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই সোমবার বন্ধ থাকবে। আজ সোমবার সকালে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের একটি জেলায় বেশকিছু কিশোর শিক্ষার্থী বিক্ষোভের সমর্থনে স্লোগান দেয়। এ সময় সেখানে যাতায়াতকারী গাড়িগুলো হর্ন বাজিয়ে তাদের সমর্থন জানায়। তুর্গোট হাইস্কুলের বাইরে একটি কার্ডবোর্ডের প্লেকার্ডে লেখা ছিল, ‘রিসোর্স না দিলে, চুপ থাকা হবে না’, ‘পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই’।

পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর রেনে-তে ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী মন্তেনিয়া লিসের বাইরে জড়ো হয়, যাদের একজনের হাতে থাকা প্লেকার্ডে লেখা ছিল ‘পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই’। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বর্দোতে দাঙ্গা পুলিশের সতর্ক উপস্থিতির মধ্যেই কিছু শিক্ষার্থী ক্লাসে ফিরে আসে, আবার অনেকে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে।

বার্তা সংস্থা এএফপি-র সাংবাদিকরা জানান, গুস্তাভ আইফেল হাইস্কুলের বাইরের কিছু আন্দোলনকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ছুড়লে পুলিশও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে প্রতিক্রিয়া জানায়; তবে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি শান্তই ছিল। উত্তরাঞ্চলীয় লিলে শহরে মাস্ক পরা আন্দোলনকারীরা বাস স্টপ ভাঙচুর করে বা ডাস্টবিনে আগুন দেয়, যার জবাবে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের দিকে টিয়ার গ্যাস ছুড়ে মারে।

স্টাফ ও সম্পদের অভাবে ধর্মঘটে নামা শিক্ষকদের সমর্থনে ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপশহর ক্রাতেই-এর একটি হাইস্কুল থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি গতি পেয়ে সমগ্র ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ে। বাস স্টপ ভাঙচুর, স্কুলের প্রবেশদ্বারে আগুন দেওয়া থেকে শুরু করে এই আন্দোলন এক সময় বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে রূপ নেয়। দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর মতে, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে ২৪টি স্কুল পোড়ানো বা তছনছ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। আন্দোলনকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগের অভিযোগ এনেছে এবং পুলিশি বর্বরতার অন্তত তিনটি ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।

অভিভাবকদের দায়িত্ব

দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষক অনুপস্থিতি এবং শূন্য পদগুলো পূরণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লোকোর্নু রোববার একটি সময়সূচি নির্ধারণ করেছেন। দেশের জরাজীর্ণ স্কুল ভবনগুলোর সংস্কারের বিষয়ে আলোচনার জন্য তিনি মঙ্গলবার আঞ্চলিক প্রধানদের নিয়ে একটি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। সরকার সংসদে এমন একটি বিল পাস করার আশাও করছে, যাতে সরকারি সম্পত্তি নষ্টকারীদের সাধারণ করদাতার অর্থের বদলে নিজেদের পকেট থেকে মেরামতের খরচ দিতে বাধ্য করা যায়।

সরকারের মুখপাত্র মড ব্রেজোঁ এই বিলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে সি-নিউজ সম্প্রচারমাধ্যমকে বলেন, ১৪, ১৫, ১৬ বছর বয়সীরা যখন সকাল ৯টায় বাস স্টপে আগুন দেয় কিংবা আরও গুরুতর বিষয় যেমন, নিজের পড়ার স্কুলেই আগুন লাগায়, তখন সেটা অভিভাবকদের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আন্দোলন শুরুর আগেই উত্থাপিত এই খসড়া বিলের বিষয়ে লোকোর্নু বলেছেন, এই আইনের মাধ্যমে সর্বনিম্ন আয় সংরক্ষণ নিশ্চিত করার সাথে সাথে পারিবারিক ভাতা ও আবাসন সুবিধা থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ কেটে নেওয়া সম্ভব হবে।

তবে সিজিটি লেবার ইউনিয়নের প্রধান সোফি বিনে একে সস্তা জনপ্রিয়তার ঘোষণা বলে সমালোচনা করে বলেন, এটি সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে।

আরো