সাগরে লঘুচাপ ঘনীভূত, ধেয়ে আসতে পারে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’

সাগরে লঘুচাপ ঘনীভূত, ধেয়ে আসতে পারে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এটি বর্তমানে পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও আশেপাশের এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর ও ঘণীভূত হতে পারে।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) এমন পূর্বাভাস জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

বঙ্গোপসাগরের এই সুস্পষ্ট লঘুচাপটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে জানা গেছে। ঘূর্ণিঝড়টি তৈরি হলে এর সম্ভাব্য লক্ষ্যস্থল হতে পারে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ বা তামিলনাড়ু উপকূল। এর প্রভাবে আগামী মঙ্গলবার দেশের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। রাজধানী ঢাকাতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারতের আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, সোমবার সকালের মধ্যেই সাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়ে যাবে। তা উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে বুধবারের মধ্যে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়বে পশ্চিমবঙ্গ উপকূলেও।

শনিবার দুপুরের বুলেটিন বলছে, পূর্ব-মধ্য এবং সংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের উপর যে নিম্নচাপ অঞ্চলটি ছিল, তা সকালে সুস্পষ্ট নিম্নচাপ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এর সংলগ্ন ঘূর্ণাবর্তটি রয়েছে সমুদ্রতল থেকে ৫.৮ কিলোমিটার উচ্চতায়। শনিবারই নিম্নচাপ অঞ্চলটি আরও ঘনীভূত হয়ে পূর্ণাঙ্গ নিম্নচাপে পরিণত হবে। তখনও তার অবস্থান পূর্ব-মধ্য এবং সংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টি তৈরি হলে এর নাম হতে পারে ‘অর্ণব’।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক জানান, সুস্পষ্ট লঘুচাপটি আজই নিম্নচাপে রূপ নিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে গভীর সাগরে বিচরণ করা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

সাগরে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির আগে চারটি ধাপ অতিক্রম করে: প্রথমে লঘুচাপ, এরপর সুস্পষ্ট লঘুচাপ, নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ এবং তার পরে আরও শক্তি নিয়ে এটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।

আগামী সোমবার এটি উপকূলে আঘাত হানতে পারে। তবে বাংলাদেশে এর প্রভাব খুব বেশি অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা নেই। এর প্রভাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। ঢাকায় বৃষ্টি হতে পারে মঙ্গলবারের দিকে। তবে বৃষ্টির পরিমাণ খুব বেশি নাও হতে পারে।

এদিকে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টি নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণাধীন ৫১টি স্টেশনের কোনো স্টেশনেই শুক্রবার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়নি। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, গত কয়েক দিনে বঙ্গোপসাগরে একের পর এক লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব বেশি থাকায় বাতাস সাগরমুখী হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের স্থলভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা কমে যায়। দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য বাড়ছে। দিনের বেলায় গরম থাকলেও রাত ও ভোরের দিকে তাপমাত্রা কমে আসছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে শীতের আমেজ অনুভূত হতে শুরু করেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগের দুই-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। এই সময়ে সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। সকাল ৬টার আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রামের আমবাগানে, ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আগামীকাল রোববার অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

সোমবার চট্টগ্রাম বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।

মঙ্গলবার খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।

বুধবার রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এখন তার বেগ ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার। গভীর নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার পর রবিবার হাওয়ার বেগ বেড়ে ৫০-৬০ কিলোমিটারে পৌঁছে যেতে পারে। দমকা হাওয়ার বেগ থাকতে পারে ৭০ কিলোমিটারও। সোমবার সকালে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলে সাগরের উপর ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া বইবে। দমকা হাওয়ার বেগ ছাড়িয়ে যেতে পারে ৯০ কিলোমিটারও। উপকূলের দিকে ঘূর্ণিঝড় যত এগোবে, হাওয়ার বেগ তত বাড়বে। পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে মঙ্গলবার থেকে ঝোড়ো হাওয়ার বেগ থাকবে ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪৫ কিলোমিটার। এর ফলে সমুদ্র উত্তাল হবে।

বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নাম ঠিক করে এই অঞ্চলের ১৩টি দেশ। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) প্যানেল সদস্য দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন।

এই দেশগুলোর নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী তৈরি তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণ হয়।

তালিকা অনুযায়ী পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়টির নাম হবে ‘অর্ণব’। এই নামটি বাংলাদেশের দেওয়া, যার অর্থ সাগর।

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের প্রচলন হয় ২০০০ সালে। ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের কারণ সম্পর্কে ডব্লিউএমও বলছে, একই সময়ে কোনো অঞ্চলে একাধিক ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়া অসম্ভব কোনো ব্যাপার নয়। এ কারণে ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেওয়া হলে সম্ভাব্য বিভ্রান্তি এড়ানো সহজ হয়।

বঙ্গোপসাগরের পাশাপাশি বর্তমানে আরব সাগরেও একটি লঘুচাপ সক্রিয় আছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির জানান, এটিরও ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা আছে।

তিনি বলেন, ‘যে লঘুচাপটি আগে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে, সেটির নাম হবে অর্ণব।’

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলে সেটির সম্ভাব্য অভিমুখ অন্ধ্র উপকূল হবে বলে মনে করেন এই আবহাওয়াবিদ।

তালিকা অনুযায়ী, এর পরেরটির নাম হবে ‘মুরাসু’। এই নামটি প্রস্তাব করেছে ভারত। তামিল ভাষায় ‘মুরাসু’ বলতে একটি ঐতিহ্যবাহী ঢোল—ডঙ্কাকে বোঝায়। ঐতিহাসিকভাবে রাজকীয় ঘোষণা দেওয়া, জনসাধারণের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া কিংবা কোনো সম্প্রদায়কে সতর্ক করার আগে ডঙ্কা বাজানো হতো।

আরো