মেয়র-কাউন্সিলররা পলাতক, ২০ ওয়ার্ডের কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর

সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সরকারের পতনের পর পরই রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) মেয়র ও অধিকাংশ কাউন্সিলররা আত্মগোপনে রয়েছেন। গত ১২ দিন ধরে মেয়র-প্যানেল মেয়রসহ ২৬ জন কাউন্সিলর পলাতক। এতে একমাত্র জরুরি সেবা ছাড়া বন্ধ রয়েছে অন্যসব সেবা। ১০ তলা ভবনের ৫ তলা পর্যন্ত অগ্নিসংযোগে পুড়ে যাওয়ায় ঠিকমতো অফিসই করতে পারছেন না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়েছে কাউন্সিলরদের অন্তত ২০টি ওয়ার্ড কার্যালয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই দিন সন্ধ্যায় রাজশাহী নগরভবনে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ছাই-ভস্ম এখনো পড়ে আছে নগর ভবনে। বাইরে থেকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ও আগুনের চিহ্ন স্পষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে নগরভবনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসে কাজ করার মতো কোনো অবস্থা নেই। নগর ভবনের পাশাপাশি কাউন্সিলরদের অন্তত ২০টি কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নাগরিক সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নাগরিকরা।
সূত্র মতে, গত বছরের ২১ জুন রাসিক নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন।

ওই নির্বাচনে সিটি কর্পোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডের ২৬টিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এসব কাউন্সিলরদের সবাই ছিলেন মেয়র লিটনের ঘনিষ্ঠ। ফলে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পরই পলাতক রয়েছেন মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনসহ ওই কাউন্সিলররা। নগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা রজব আলী দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় আটক হয়েছেন। মেয়রসহ বাকি কাউন্সিলররাও রয়েছেন আত্মগোপনে।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, আগুন দেওয়া হয়েছে মেয়রের বাড়িসহ ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তৌহিদুল হুক সুমনের বাড়ি ও ওয়ার্ড কার্যালয়ে। এ ছাড়া ১, ২, ৩, ৫, ৬, ৭, ১৩, ১৪, ১৭, ১৮, ২০, ২১, ২২, ২৩, ২৪ ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়সহ অন্তত ২০টি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট করা হয়।

এসব ওয়ার্ড কার্যালয় ও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নগরবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওয়ার্ড কার্যালয়গুলো এখনো ভাঙাচোরা। গ্রেপ্তার আতঙ্কে পালিয়ে আছেন কাউন্সিলররাও। গত কয়েকদিনে সিটি কর্পোরেশনের আওতায়ধীন নগরবাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম, জরুরি সেবাও ওয়ার্ডভিত্তিক বিভিন্ন নাগরিক সেবা চরমভাবে ভেঙে পড়েছে।
নগরীর শপুরা এলাকার বাসিন্দা আফছার আলী বলেন, ‘আমার এলাকার রাস্তায় যে সড়কবাতিগুলো রয়েছে, সেগুলো কয়েকদিন থেকে জ্বলছে না। একেবারে ভূতুরে অবস্থা বিরাজ করছে। এমনিতেই মাঠে পুলিশ নেই তার ওপর আবার অন্ধকার। সঙ্গত কারণে এলাকায় ছিনতাই-চুরি ও লুটপাট বেড়ে গেছে।

নগরীর ২৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা রায়হান আলী বলেন, ‘বুধবার (০৮ আগস্ট) কাউন্সিলর অফিসে জরুরি একটি কাজে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি তালাবদ্ধ। ওয়ার্ডের অনেকেই বিভিন্ন দরকারি কাজে কার্যালয়ে এসে ফিরে যাচ্ছে। এভাবে পুরো নগরীতেই নাগরিক সেবা ভেঙে পড়েছে।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘সরকারের পদত্যাগের পরপরই রাজশাহীসহ দেশব্যাপী বেশকিছু উচ্ছৃঙ্খল ঘটনা ঘটেছে, যা কারো কাম্য নয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ নাগরিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমতাবস্থায় যারা নাগরিক সেবা প্রদান করেন তারা এই মূহূর্তে আত্মগোপনে রয়েছে। তবে যেহেতু দেশে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন হয়েছে, আমি আহ্বান জানাব, যেসব নাগরিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অচল রয়েছে, সেগুলো আগে জরুরিভিত্তিতে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া।’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র-কাউন্সিলরদের অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে নাগরিক সেবা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য সেনাবাহিনী কিংবা প্রশাসনের উদ্যোগে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) ড. এ.বি.এম শরীফ উদ্দিন বলেন, নাগরিক সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের যেসব উপকরণ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, সেটিই তো বিধ্বস্ত। সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নগরভবন পরিস্কার করার উদ্যোগ চলছে। আশা করছি, দ্রুত সেটি আমাদের কাছে হস্তান্তর করবে। এরপর আমরা আপাতত এক রুমে কয়েকজন করে বসে সার্ভিস চালুর ব্যবস্থা করব।’

আরো