`মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

ইসলাম মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্পর্কের একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে। এই সম্পর্কের মূলে রয়েছে মুসলিমদের একে অপরের প্রতি দায়িত্ব ও অধিকার। এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে রাসুল (সা.)-এর একটি বাণীতে, যেখানে
তিনি বলেছেন, ‘মুসলিম সেই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে। আর মুহাজির সেই, যে আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন, তা পরিত্যাগ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০)
হাদিসের তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা
এই হাদিসে রাসুল (সা.) মুসলিম, মুমিন, মুজাহিদ ও মুহাজিরের সংজ্ঞা দিয়েছেন। এটি কেবল পরিচয়ের সংজ্ঞা নয়; বরং ইমানের পূর্ণতা ও উত্তম চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে। হাদিসের প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ‘মুসলিম সেই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।’
এর অর্থ, একজন প্রকৃত মুসলিম তার কথা ও কাজের মাধ্যমে অন্য মুসলিমদের কোনো ক্ষতি করেন না। এটি ইসলামের পূর্ণতার একটি লক্ষণ। তবে এর মানে এই নয় যে যিনি এই গুণ অর্জন করতে ব্যর্থ হন, তিনি ইসলামের বাইরে চলে যান; বরং এটি ইমানের কমাল বা পূর্ণতার দিকে ইঙ্গিত করে। (ইদরিস আহমদ, আল-মুসলিম মিন সালিমাল মুসলিমুন, পৃ. ৪৫, দারুল হিকমা, কায়রো, ২০২০)
একইভাবে হাদিসের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, ‘মুহাজির সেই, যে আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন, তা পরিত্যাগ করে।’ এখানে মুহাজির বলতে শুধু ভৌগোলিক হিজরত নয়; বরং পাপ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকার কথা বলা হয়েছে।
যখন ভৌগোলিক হিজরতের সুযোগ শেষ হয়ে গেল, তখন রাসুল (সা.) সাহাবাদের জানিয়েছিলেন যে প্রকৃত হিজরত হলো আল্লাহর নিষেধকৃত কাজ ত্যাগ করা। এটি ইমানের পূর্ণতার আরেকটি দিক। (ইবনে হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১/৬৫, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ২০১৮)।
অন্য একটি রিওয়ায়েতে ফাদালা ইবনে উবায়দ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম সেই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে। মুমিন সেই, যার কাছে মানুষ তাদের জান-মালের নিরাপত্তা পায়। মুজাহিদ সেই, যে আল্লাহর আনুগত্যের জন্য নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে। আর মুহাজির সেই, যে পাপ ও অপরাধ ত্যাগ করে’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৩৭৫৮)।
এই বর্ণনা হাদিসের অর্থকে আরও বিস্তৃত করে এবং ইমানের বিভিন্ন স্তর ও চরিত্রের পূর্ণতার দিকে ইঙ্গিত করে।
হাদিসের শিক্ষা:-
হাদিস থেকে আমরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই, যা মুসলিম জীবনের নীতি ও আচরণের মান নির্ধারণ করে:
১. অন্যের ক্ষতি না করা: প্রকৃত মুসলিম তার কথা ও কাজের মাধ্যমে অন্য মুসলিমদের ক্ষতি থেকে বিরত থাকেন। জিহ্বা দ্বারা ক্ষতি বলতে গিবত, অপবাদ, অশ্লীল কথা এবং হাত দ্বারা ক্ষতি বলতে অন্যায়ভাবে আঘাত করা, সম্পদ হরণ বা অন্য কোনো ক্ষতি করা বোঝায়।
হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, ‘সত্যিকারের নেককার ব্যক্তি তাঁরা, যাঁরা এমনকি পিঁপড়া বা কীটপতঙ্গেরও ক্ষতি করেন না।’ (আল-মুসলিম মিন সালিমাল মুসলিমুন, পৃ. ৫২, দারুল হিকমা, কায়রো, ২০২০)।
২. ইমানের স্তরবিন্যাস: এই হাদিস ইমানের বিভিন্ন স্তরের কথা বলে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘প্রকৃত মুমিন তারা, যাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে কেঁপে ওঠে এবং তাঁর আয়াত পাঠ করা হলে তাদের ইমান বৃদ্ধি পায়’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২)।
যিনি অন্যের ক্ষতি থেকে বিরত থাকেন এবং আল্লাহর নিষেধকৃত কাজ ত্যাগ করেন, তিনি ইমানের উচ্চতর স্তরে পৌঁছান।
৩. ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য: হাদিসটি মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে। বিচারক আল-কাদি বলেছেন, ‘ঐক্য ইসলামের একটি ফরজ এবং শরিয়তের মৌলিক ভিত্তি। এটি মুসলিম সমাজের শক্তি ও সংহতির প্রতীক’ (ফাতহুল বারি, ১/৭০, দারুল মা’রিফা)

আরো