অতিথি আপ্যায়নে মহানবী ﷺ এর আদর্শ
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
প্রায় সব ধর্মে অতিথি বা মেহমানকে ভালোভাবে আপ্যায়ন করার নির্দেশ রয়েছে। মানবতার ধর্ম ইসলামে অতিথি আপ্যায়ন সওয়াবের কাজ বলে বিবেচিত। যেসব ভালো গুণের সম্মিলন একজন মানুষকে সামাজিকভাবে ভালো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, অতিথিপরায়ণতা এর অন্যতম। অতিথিপরায়ণতা ইসলামের অন্যতম একটি বিধানও বটে। এই গুণটির কারণে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ তৎকালীন সময়ে কাফের-মুশরিকদের কাছেও সমাদৃত ছিলেন।
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু শুরায়হ খুয়ালিদ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন তার মেহমানের সম্মান ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে হক আদায় করে। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ ﷺ মেহমানের হক কী? তিনি বলেন, একদিন এক রাত, সর্বোচ্চ মেহমানদারি তিন দিন পর্যন্ত, এর অতিরিক্ত হলো সদকাস্বরূপ। (সহিহ বোখারি ও মুসলিম)
একদা একজন নারী রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে তার স্বামীর বিষয়ে অভিযোগ করলেন। তিনি বললেন যে, তার স্বামী অনেক অতিথিকে আমন্ত্রণ জানান এবং তাদের জন্য বারবার খাবার প্রস্তুত ও তাদের আপ্যায়ন করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ কোনো উত্তর দিলেন না, আর সেই নারী চলে গেলেন।
পরবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ সেই নারীর স্বামীকে ডেকে বললেন, “আজ আমি তোমার অতিথি হবো।”
সেই ব্যক্তি অত্যন্ত খুশি হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়ে তার স্ত্রীকে বললেন, “আল্লাহর রাসুল ﷺ আজ আমাদের অতিথি হবেন।”
তার স্ত্রী খুব আনন্দিত হলেন এবং অনেক চেষ্টা ও যত্ন নিয়ে যা কিছু খাবার ছিল তা দিয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য খাবার প্রস্তুত করলেন।
যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের ঘরে এসে তাদের আতিথেয়তার সম্মান গ্রহণ করলেন, তখন তিনি সেই ব্যক্তিকে বললেন, “তোমার স্ত্রীকে বলো, সে যেন সেই দরজা দেখে, যেখান দিয়ে আমি এই ঘর ত্যাগ করব।”
উক্ত মহিলা সেই দরজার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পেছনে ঘর থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী, বিচ্ছু এবং ক্ষতিকর জীব বের হয়ে যাচ্ছে। তিনি এ দৃশ্য দেখে এতটাই বিস্মিত হলেন এবং আল্লাহর মহান কুদরত উপলব্ধি করে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।
যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন-“এটাই ঘটে যখন একজন অতিথি তোমার ঘর থেকে বিদায় নেয়। তার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ক্ষতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিপদ তোমার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। অতিথির প্রতি সম্মান দেখিয়ে এবং আপ্যায়নের কষ্ট স্বীকার করার পেছনে এটাই হেকমত।”
রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও বলেন, “যে ঘরে বেশি অতিথি আসে, আল্লাহ সেই ঘরকে ভালোবাসেন। এর চেয়ে উত্তম ঘর আর কিছুই হতে পারে না যেখানে তরুণ ও বৃদ্ধ সবার জন্য দরজা খোলা থাকে। এমন ঘরে আল্লাহর রহমত ও বরকত নেমে আসে।”
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যখন আল্লাহ কোনো জাতির জন্য কল্যাণ চান, তখন তিনি তাদের জন্য একটি উপহার পাঠান।” সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ধরণের উপহার, হে আল্লাহর রাসুল?” তিনি বললেন, “অতিথি তার নিজের রিজিক নিয়ে আসে এবং গৃহের লোকদের পাপ সঙ্গে নিয়ে যায়।”
অতিথি হলো জান্নাতে যাওয়ার একটি মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, তাকে অবশ্যই তার অতিথির প্রতি উদার হতে হবে।” [বুখারি : ৫৫৬০]
মহানবী ﷺ এর প্রতি যখন প্রথম ওহি অবতীর্ন হবার পর তার মধ্যে ভীতির সঞ্চার হলে হজরত খাদিজা (রা.) মহানবী ﷺ কে অভয় দিয়ে কিছু গুণাবলীর কথা বলেছিলেন- এমন গুণাবলির অধিকারীকে আল্লাহতায়ালা কীভাবে ধ্বংস করতে পারেন বা তার প্রতি কীভাবে অসন্তুষ্ট হতে পারেন? সেগুলোর মধ্য থেকে অতি উৎকৃষ্ট যে বৈশিষ্ট্য ও গুণের কথা বলেছিলেন তা ছিল- মহানবী ﷺ এর আতিথেয়তা।
যে ঘরে মেহমানের আগমন বেশি হয়, সে ঘরে আল্লাহর রহমতের বর্ষণ বেশি হয়। কারও এটা ভাবা মোটেও উচিত নয় যে, মেহমান আসার কারণে অধিবাসীদের রিজিক কমে যায়। রিজিক কমে যায়নি বরং তাদের ভাগ্যে আল্লাহতাআলা সৃষ্টির আগেই এই রিজিক লিখে রেখেছিলেন।
মানবতার মহান বন্ধু মহানবী ﷺ আমাদের জন্য আতিথেয়তার যে অনুপম আদর্শ রেখে গেছেন তা আমাদরকে পালনের তৌফিক দান করুন।
