মনোযোগবিহীন সালাত: শির্কের অনুশীলন
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
তাওয়াজ্জু আরবী শব্দ। তাওয়াজ্জু থেকে মোতোয়াজ্জু শব্দটি এসেছে। এর অর্থ হলো—
সচেতনভাবে মনোযোগী হওয়া , একনিষ্ঠভাবে মন ফিরানো , মনকে কেন্দ্রীভূত করা। সালাতে তাওয়াজ্জু হলো সালাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যা করা হয় এবং যা পড়া হয় তা শুধু আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মোতাবেক সম্পাদন করা। আল্লাহ ছাড়া অন্য ইলাহ বা গায়রুল্লাহর হুকুমের চিহ্ন সালাত থেকে মুছে ফেলা।
সালাতের প্রধানতমঃ উদ্দেশ্য হলো সালাতকে শির্কমুক্ত করে—আমাদের যাপিত জীবন থেকে শির্ককে ঝেঁটিয়ে দূর করা। সালাত শির্কমুক্ত হলে আমাদের বৃহত্তর পরিসর থেকেও শির্ক বিদায় নিবে। সালাতকে শির্কমুক্ত রাখার শপথ হিসেবে এর শুরুতে সুরা আনয়ামের ৭৯ নং আয়াত إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِ……مِنَ ) الْمُشْرِكِينَ ) পাঠ করা হয়। দুঃখজনক বিষয় হলো মুসলিম জাহানের সর্বত্র সুরা ফাতিহা পড়ার পূর্বে অবচেতনভাবে মন্ত্রের মতো এ আয়াত পাঠ করা হলেও এর অর্থ এবং তাৎপর্য সম্পর্কে তারা বেখেয়াল। এ বেখবর অবস্থাকেই কোরানে সুরা নিসার ৪৩ নং আয়াতে “সুকারা” (سُكَارَىٰ) বা মনোযোগহীন (absent mind ) অবস্থা বলা হয়েছে। এই সুকারা অবস্থায় সালাত করতে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।
মনকে একমাত্র বিশ্বজাহানের মহান প্রতিপালক ও সৃষ্টিকর্তার আদেশ-নিষেধের দিকে মোতোয়াজ্জু করে সালাত থেকে শির্ক দূর করতে না পারলে আমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও সামষ্টিক জীবন থেকে শির্ক দূর করা সম্ভব হবে না। আমাদের পবিত্র কালেমা হলো বৃক্ষের বীজের মতো ( সুরা ইব্রাহিমঃ ২৪ ,২৫) । বীজ ভালো হলে ফসলও ভালো হয়। নিম গাছের বীজ থেকে সুমিস্ট আম আশা করা যায় না। তেমনি শির্ক মিশ্রিত কালেমা থেকে বিশুদ্ধ সালাত কস্মিনকালেও কায়েম হবে না। কালেমা তাওহীদ শির্কমুক্ত হলে সালাত শির্ক মুক্ত হবে। আমাদের কালেমার মধ্যে নবীগনের মধ্যে ফারক বা বৈষম্যের চিহ্ন বিদ্যমান। যে কারণে শির্কযুক্ত কালেমার অনুসারীগন সালাতের পরতে পরতে শির্কের চাষাবাদ করে চলেছেন। অথচ সালাত শির্কমুক্ত হলে যাপিত জীবনকে শির্কমুক্ত রাখা সম্ভব হতো।
ইন্নি ওজ্জিয়াহাতু—এই আয়াত সালাতের শুরুতে পড়ার মাধ্যমে আমরা শপথ করি যে , ” আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখ ফিরালাম তাঁর দিকে, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং যারা শির্ক করে মুশরিক হয়েছে আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই।”
সালাতে তাওয়াজ্জু বা মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা। কিসের দিকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হবে। কিসের দিকে তাওয়াজ্জু হবে ? আল্লাহ উপরের আয়াতে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। যারপ্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করবো তিনি হবেন আসমান ও জমিনের সৃষ্টিকর্তা। তিনি যা নাজিল করছেন—এর বাইরে নবী-রাসুল , সাহাবী , খলিফা , মাযহাবের ইমাম , ফতোয়া দানকারী মুফতি ,মোহাদ্দিস , মুফাসসির কারো বিধান-মানাসিক সালাতে আনবো না । কারণ এরা কেউ আসমান-জমিনের সৃষ্টিকর্তা নয়। আমার সালাত এবং সালাতের মানাসিক বা ম্যানুয়েল পদ্ধতি একমাত্র আল্লাহর শিখানো পদ্ধতিতে করবো। এর বাইরে গেলেই শির্কের ভয়বহ অপরাধ । আমি শির্কের অপরাধীদের সাথে সামিল হবো না ।
এখন কথা হলো সালাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা কি এই তাওয়াজ্জুর মধ্যে থাকি ? না আমরা বর্ডার লাইন ক্রস করে শির্কের মধ্যে ঢুকে পড়ি । আমাদের মধ্যে নাসিরুদ্দিন আলবানীসহ অনেকে রাসুলুল্লাহর সালাতের জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন। নবী-রাসুলকে দেয়া আল্লাহর নেআমত সালাত। এ সালাতের নিয়ম-কানুন এবং পঠিত বিষয়ে সংগোপনে শির্ক বাসা বেঁধে আছে। আল্লাহর দেয়া বিশ্বাস-বিবেক শক্তি কাজে না লাগানোর কারণে সালাতে শির্কের মিশ্রনের বিষয়ে আমাদের কোনো ধারনা নেই।
সালাতের তাওয়াজ্জু হিসেবে সুরা আনয়ামের এই ১৬২ নং আয়াতও আমার পাশের মুসুল্লিকে মাকামে ইবরাহীমের চত্বরে পাঠ করতে শুনেছি—
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
এ আয়াত মোতাবেক সালাত যেমনি আল্লাহর জন্য, তেমনি সালাতের নুসুকও (نُسُكِي) হতে হবে আল্লাহর। নুসুক হলো —কর্মপদ্ধতি ,কর্মপন্থা , ম্যানুয়েল । সালতের নুসুক হলো সালাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরাবাহিক আহকাম । সালাতে যা করা হয় এবং যা পড়া হয় তা’হলো সালাতের নুসুক বা পদ্ধতি। মানব জীবনে জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সকল কাজ যেমন আল্লাহর হুকুম মোতাবেক হ’তে হবে—তেমনি একজন মুসুল্লির সালাতের তাকবীরে তাহরিমা থেকে সালাম ফিরানো পর্যন্ত আল্লাহর কোরআনের নুসুক মোতাবেক হলেই শির্কমুক্ত সালাত
নিশ্চিত হবে ,ইনশাল্লাহ।
কালেমা তাইয়্যেবার বিকশিত রূপ হলো সালাত। এ সালাত হলো—কোরান অধ্যয়ন এবং সালাতকে একমাত্র কোরান অনুগামী করার এক অবিরাম প্রচেষ্টা। সালাতের বাইরের জীবনকে সালাত এবং কোরআন মোতাবেক গড়ে তোলাই হলো দ্বীন-উল হকের উদ্দেশ্য।
