ঈমান ও কুফর: পাশাপাশি বসবাস
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
মহান আল্লাহর কাছ থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিধি-বিধান বা শরীয়ত পেয়েছেন সেসব বিধি-বিধান ১) অন্তরে বিশ্বাস (২) মৌখিক স্বীকৃতি এবং (৩) শরীয়তের সেসব হুকুম- আহকাম আমলে রূপায়নের নাম ঈমান। *”যিনি নিঃসংকোচে নিঃশর্তে এসব সম্পন্ন করেন তিনিই হলেন একজন মুসলমান।*
পক্ষান্তরে এসব বিধি-বিধান অস্বীকার করা কুফরের নামান্তর।
আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহঃ) বলেন- ঈমান হলো অন্তরের এমন একটি পর্যায়ের ক্রিয়া প্রক্রিয়া যা প্রত্যেকটি বিষয়ে ইসলামী শরীয়তের হুকুম আহকাম মেনে চলার আন্তরিক প্রতিজ্ঞা ও বাস্তবে গ্রহণ করে নেয়াকে বাধ্য করে।
*কুফর ও কাফির* : কুফর অর্থ কোন কিছুকে গোপন করা। শরীয়তের ভাষায়- কুফর বলতে যা বুঝায় তা হলো দ্বীনি বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত যে সব বিষয়কে অপরিহার্য অলঙ্ঘনীয়রূপে মেনে চলার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থাপন করেছেন সেগুলোর কোন বিষয়কে অস্বীকার করা বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশনার বিপরীতে ইসলাম বিরোধী কোন বিধানকে বিশ্বাস করা এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত বিধান ও আদর্শের কোনটিকে অস্বীকার করা। যে ব্যক্তির দ্বারা এমন কাজ সংগঠিত হবে ইসলামের পরিভাষায় তাকে কাফির বলা হয়।
*মুরতাদ*: ইসলামী শরীয়্যাহ কর্তৃক দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত, অপরিহার্যভাবে মেনে চলার জন্য নির্ধারিত *এক বা একাধিক বিষয়কে অস্বীকার করলে মুসলমান মুরতাদ হয়ে যায়।*
জগৎ বিখ্যাত মুহাদ্দিস আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহঃ) তাঁর রচিত “ইকফারুল মুলহিদীন” গ্রন্থে লিখেছেন, যে ব্যক্তির ইসলামী শরীয়্যাহ কর্তৃক অপরিহার্যরূপে মেনে চলার জন্য নির্ধারিত কোন একটি বিষয়কে অস্বীকার করলো বস্তুত সে আল্লাহর কিতাবের অংশ বিশেষের প্রতি ঈমান আনলো আর অস্বীকার করলো অংশ বিশেষকে এমতাবস্থায় সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত বলেই গণ্য হবে। *অর্থাৎ সে মুরতাদ হয়ে যাবে।* উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়-
(ক) নামায অস্বীকারকারী, যার সম্পর্কে আল্লামা আইনী বলেন, আর নামায অস্বীকৃতি সম্পর্কে ইসলামী আইন বেত্তাগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো “যে ব্যক্তি নামাযের অপরিহার্যতায় অস্বীকার প্রসূত নামায বর্জন করলো সে মুরতাদ”।
(খ) যাকাত অস্বীকারকারী, যাদেরকে স্বীয় খিলাফতকালে আবূ বাকার সিদ্দীক (রাঃ) মুরতাদ ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।
(বুখারী- আধুনিক প্রকাশনী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২৪৭ পৃষ্ঠা)
*যে সকল কুফরীর কারণে মুসলমান কাফির হয় এ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আরো স্পষ্টভাবে দলিল সহকারে সৌদি সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত “হাজ্জ ‘উমরাহ ও যিয়ারত নির্দেশিকা” নামক পুস্তকে এভাবেই তুলে ধরা হয়েছে :*
১) *মাধ্যম ও উসিলা*: যারা নিজেদের ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যে মাধ্যম বা উসিলা নির্বাচন করতঃ তাদেরকে মাধ্যম হিসাবে সাব্যস্ত করে এবং তাদের উপর ভরসা করে- তারা সর্বসম্মতিক্রমে কাফির।
২) *মুশরিক ও কাফিরদের বিষয়ে সন্দেহ পোষণ*: যারা মুশরিকদেরকে কাফির মনে করেনা বা তাদের কুফরীতে সন্দেহ পোষণ করে তাদের ধর্মকে সঠিক বলে বিশ্বাস করে তারা কাফির।
৩। *তাগুতের হুকুমকে প্রাধান্য দেয়া* যে ব্যক্তি *তাগুতের* হুকুমকে মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর মনে করে- অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পথ অপেক্ষা অন্য কারো পথ ও মতকে অধিকতর সঠিক অথবা অন্য কারো নির্দেশ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ অপেক্ষা উন্নত মনে করে সে ব্যক্তি কাফির।
*এই জাতীয় আরও কিছু কুফরী* প্রিয় পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরছি-
ক) মানব রচিত বিধান ও মতবাদকে ইসলামী শরীয়ত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে বিশ্বাস করা, অথবা এ কথা মনে করা যে, এই শতাব্দীতে ইসলামী বিধান যুগোপযোগী নয়, অথবা মনে করা যে, একমাত্র ইসলামই হচ্ছে মুসলমানদের পশ্চাদপদতার কারণ, অথবা মনে করা যে, ধর্ম প্রভু পরওয়ারদেগার ও মানুষের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। অন্যান্য ক্ষেত্রে ধর্মের প্রবেশ নিষিদ্ধ। *এসব ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসীরা কাফির*
খ) আল্লাহর নির্দেশ মুতাবিক চোরের হাত কাটা অথবা বিবাহিত ব্যভিচারীকে প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করা আধুনিককালে যুগোপযোগী ও যুক্তিসঙ্গত নয়;
*এমন ধারণা পোষণকারীরা কাফির।*
গ) যারা মনে করে-শরঈ বিষয়ে অথবা হুদুদ (শাস্তির নির্ধারিত সীমা) বা অন্যান্য ব্যাপারে আল্লাহর নাযিল করা বিধান ছাড়া বিচার ফায়সালা করা জায়িয; যদিও সে বিশ্বাস করে যে, তার ফায়সালা শরঈ বিধান অপেক্ষা নিকৃষ্ট। কেননা এর ফল দাঁড়াবে এই যে, কখনো কখনো সে অবধারিত হারাম বস্তুকে হালাল মনে করে নিবে আর যারা নিশ্চিত হারাম *যেমন- যিনা, মদ, খুন ইত্যাদিকে হালাল মনে করে তারা কাফির*
৪) মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনীত শরঈ বিধানের কোন কিছুর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি কাফির যদিও সে উক্ত বিধানের উপর অসন্তুষ্ট চিত্তে ‘আমল করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-
ذلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
*”এটা এজন্য যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তারা তা পছন্দ করে না। সুতরাং আল্লাহ তা’আলা তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দেবেন।”* (সূরা মুহাম্মাদ ১৯)
৫) শরীয়তে মুহাম্মাদীর কোন অনুশাসন অথবা তার জন্য নির্ধারিত *সাওয়াব বা শাস্তিকে যে বিদ্রূপ করবে,* সে আল্লাহ তা’আলার বাণী অনুযায়ী কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-
قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْرُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدُ إِيْمَانِكُمْ )
“তুমি বল, তোমরা কি ঠাট্টা-তামাশা করছিলে আল্লাহ ও তাঁর আয়াতগুলো এবং তাঁর রসূল সম্বন্ধে? এখন আর কৈফিয়ত পেশ করো না। তোমরা নিজেদের ঈমান প্রকাশ করার পরও তো কুফরী কাজে লিপ্ত ছিলে।” (সূরা আত-তাওবাহ ৬৫-৬৬)
৬) যাদু, যাদুর দ্বারা বিকর্ষণ করা, যেমন- কোন মানুষকে যাদুর দ্বারা তার প্রেয়সী স্ত্রীর প্রতি বিরাগভাজন করা। যাদুর আকর্ষণ; যেমন শয়তানী মন্ত্রণা দ্বারা অপছন্দনীয় কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান। সুতরাং যে ব্যক্তি এটা সম্পাদন করে অথবা এতে সন্তুষ্ট থাকে সে আল্লাহর কালাম অনুযায়ী কাফির হয়ে যায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ
“তারা কাউকে কিছু শিক্ষা দেয়ার পূর্বেই অবশ্য বলে দিত যে, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ। সুতরাং তোমরা কুফরী করো না।” (সূরা আল-বাকারা ১০২)
৭) মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদেরকে সাহায্য করা।
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-
وَمَنْ تَتَوَلَهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِى القَوْمَ الظَّالِمِينَ*
“তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে (ইহুদী খৃষ্টানদেরকে) অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে তারা তাদের মধ্যেই পরিগণিত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা অত্যাচারী জাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেননা।”
(সূরা আল-মায়িদাহ ৫১)
৮) যদি কেউ বিশ্বাস পোষণ করে যে- মুহাম্মাদুর রাসূললুল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাপ্ত বিধান হতে বের হয়ে যাওয়া কেউ বৈধ মনে করলে তবে সে কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَمَنْ تَبْتَغِ غَيْرُ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يَقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ )
“কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দীনের আশ্রয় নিতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবেনা এবং সে হবে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।”
(সূরা আল-ইমরান ৮৫)
৯) আল্লাহর দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া অথবা যেসব বস্তু ছাড়া ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনা, সে সব বস্তু সম্পর্কে অজ্ঞ ও অনবহিত থাকা এবং তার উপর ‘আমল না করা।
আল্লাহ তা’আলা বলেন-
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِرَ بِآيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ
مُنْتَقِمُونَ *
“যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নির্দেশাবলীর মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার অপেক্ষা অধিক সীমালঙ্ঘনকারী আর কে? আমি অপরাধীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি।” (সূরা আস-সাজদা ২২)
আল্লাহ আরো বলেন-
وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أَنْذِرُوا مُعْرِضُونَ *
“আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তারা অবজ্ঞা ভরে অস্বীকার করে।” (সূরা আহকাফ ৩)
১০) ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক বা ভয়ে হোক- যদি কোন ব্যক্তি উল্লিখিত ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয়ের কোন একটি সম্পাদন করে, তবে সে কাফির হয়ে যাবে। হাঁ, যদি কোন ব্যক্তিকে জবরদস্তির মাধ্যমে উক্ত কাজ করানো হয়, তবে সে এই হুকুমের আওতায় পরবেনা।
[সূত্র: হাজ্জ, উমরাহ ও যিয়ারত নির্দেশিকা। অনুচ্ছেদ- ইসলাম বিনষ্টকারী দশটি বস্তু। প্রকাশনা ও প্রচারে- গবেষণা, ইফতা ও ইরশাদ বিভাগ, রিয়াদ, সৌদি আরব সরকার।
রচয়িতা: ‘আল আক্বীদাতুস সহীহা’ প্রণেতা শায়খ আব্দুল আযীয আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ)।]
অতএব, উপরোক্ত আলোচনায় পরিষ্কার যে, *মু’মিন হওয়ার জন্য পরিপূর্ণ দ্বীনের অপরিহার্য সব বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা শর্ত।* কিন্তু কাফির সাব্যস্ত হবার জন্য দ্বীনের সব বিষয়াদির অস্বীকৃতি শর্ত নয় *বরং দ্বীনের কোন একটি অকাট্য প্রমাণিত এবং সর্বজনবিদিত বিষয়ের সমূলে প্রত্যাখ্যান বা অস্বীকৃতি পাওয়া গেলেই কাফির সাব্যস্ত হবে।*
যেহেতু ইবাদত কবুল হওয়া বা না হবার প্রশ্ন, তাই প্রয়োজনের তাগিদেই উপরোক্ত আলোচনা পেশ করা হয়েছে যাতে করে যাবতীয় কুফর হতে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে ইবাদতের স্বার্থকরূপ পেতে পারি।