ভুয়া ডিগ্রি ও ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা: দেলোয়ার নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরে তোলপাড়
বাংলাদেশে ভুয়া ডিগ্রি, জাল পরিচয় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক প্রতারণার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন Md Delower Hossen নামের এক ব্যক্তি, যিনি বিভিন্ন সময় নিজেকে Sahadat Hossen Delower কিংবা Dr. Sahadat Hossen Delower পরিচয়ে উপস্থাপন করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে—বিশেষ করে Facebook ও LinkedIn প্রোফাইলে—তিনি নিজেকে একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পরিচয়ে তুলে ধরেন। সেখানে তাকে কখনো Optom TV ও Eye Doctor TV-এর সিইও, কখনো Abira Ophthalmic-এর প্রতিনিধি, আবার কখনো Global Eye Health Consultant, Vision Awareness Educator, International Collaborator, Career Support Mentor, এমনকি Bangladesh Ophthalmic Society-এর প্রেস সেক্রেটারি ও Institute of Community Ophthalmology (ICO), চট্টগ্রাম-এর উপদেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করতে দেখা যায়।
এইসব পরিচয়, বড় বড় ব্যানার, ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি দেখে অনেকেই তাকে উচ্চশিক্ষিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন পেশাজীবী বলে ধরে নেন। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য।
তদন্তে মিলেছে বিস্ময়কর তথ্য
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি শিক্ষাগতভাবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, নোয়াখালীর একটি স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে। অভিযোগ রয়েছে—একটি স্থানীয় চক্ষু হাসপাতালে কাজ করার সময় তিনি যে SSC ও HSC সনদ জমা দিয়েছিলেন, সেগুলো ভুয়া।
এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া তে তদন্ত করে দেখা যায় তিনি কখনো ঐ ইউনিভার্সিটি তে ভর্তিই হননি কিন্তু তার প্রোফাইল ঘেটে দেখা যায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া থেকে MPHO করেছেন। অথচ তার প্রোফাইলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের Elite School of Optometry, Akash Medical College এবং অস্ট্রেলিয়ার Melbourne থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের তথ্য উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে তার পড়াশোনার কোনো প্রমাণ বা রেকর্ড পাওয়া যায়নি। তার কথিত OSB বা ICO সার্টিফিকেশনও ভুয়া বলে অভিযোগ রয়েছে।
এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া কনভোকেশন!
অভিযোগ আরও গুরুতর—তিনি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া কনভোকেশন ছবি ও ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের Facebook আইডি ক্লোন, ভুয়া পেজ খুলে মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচার, এবং অচেনা ব্যক্তিদের কাছে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করার অভিযোগও উঠেছে।
বিদেশে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করা, বিদেশি খ্যাতনামা চিকিৎসকদের প্রোফাইল অনুকরণ করে ChatGPT ব্যবহার করে ভুয়া ই-মেইল তৈরি করার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি পুলিশ যোগাযোগ করলে তিনি “যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন” বলে সময়ক্ষেপণ করে ফোন বন্ধ করে দেন—এমন দাবিও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্যখাতের জন্য বড় হুমকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রতারণা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এতে স্বাস্থ্যখাতের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়, প্রকৃত পেশাজীবীরা মানহানির শিকার হন এবং সাধারণ মানুষ আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির মুখে পড়েন। বিশেষ করে অপটোমেট্রি ও চক্ষু চিকিৎসা খাতের সুনাম মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং আদালতে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সচেতনতার আহ্বান
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় প্রতারণার ধরন আরও জটিল ও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তাই নাগরিকদের প্রতি আহ্বান—যাচাই করুন, প্রমাণ দেখুন, তারপর বিশ্বাস করুন। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর নজরদারি এবং দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।