পবিত্রতার ক্ষেত্রে পানির অপরিহার্যতা ও গুরুত্বপূর্ণ শরঈ বিধানসমূহ
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
অজু’ আরবি শব্দ, এর আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা। পরিভাষায় শরীর পবিত্র করার নিয়তে পবিত্র পানি দিয়ে শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করাকে অজু বলা হয়। অজু নামাজের অপরিহার্য শর্ত। নামাজ ছাড়াও অনেক ইবাদতের জন্য অজু করতে হয়। অজু সরাসরি মহান আল্লাহ প্রদত্ত একটি আমল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, *‘হে ইমানদারগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য প্রস্তুত হবে, তার আগে তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও দুহাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করবে এবং তোমাদের মাথা মাসেহ করবে। আর উভয় পা টাখনু পর্যন্ত ধৌত করবে।’* (সুরা মায়েদা : ৬)
ইসলামি শরিয়্যায় “তাহারাহ” বা পবিত্রতা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শের অঙ্গ। পবিত্রতা ও অপবিত্রতার মানদণ্ড মূলত: ধর্মীয় বিধি-বিধান (শরীয়্যাহ) এবং নৈতিকতার উপর ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। পবিত্রতা মূলত: দু’ভাগে বিভক্ত- (১)বাহ্যিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা (যেমন: অজু, গোসল ও নাপাকি দূর করা) (২) অভ্যন্তরীণ শুদ্ধতা (যেমন: ঈমান, সৎকর্ম, হালাল উপার্জন, কুচিন্তা ত্যাগ)।
অপবিত্রতা হলো সেই পথ থেকে বিচ্যুতি, যা শারীরিক ও আত্মিক উভয় স্তরে প্রকাশ পায়। ইসলামে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে পানির ভূমিকা অপরিসীম। পবিত্রতার সকল আনুষ্ঠানিক কাজ যথা: অজু, গোসল, নাজাসাত পরিষ্কার, প্রধানত বিশুদ্ধ পানির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্রতা অর্জনের জন্য আকাশ থেকে বর্ষিত পানির উপযোগিতা সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ করেন
وَ یُنَزِّلُ عَلَیۡكُمۡ مِّنَ السَّمَآءِ مَآءً لِّیُطَهِّرَكُمۡ بِهٖ
(আর তিনি আকাশ থেকে তোমাদের উপর পানি বর্ষণ করেন, তা দিয়ে তোমাদেরকে পবিত্র করার জন্য) [সূরা আল-আনফাল, আয়াত:১১]
উপরোক্ত আয়াতে ইসলামে পানির গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করেছে। শরিয়্যাহর বিস্তৃত পর্যালোচনায় পানির গুণাগুণ ও ব্যবহারযোগ্যতার ভিত্তিতে কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-বলেন- “পানি নিজে পবিত্র, কোনো কিছুই তাকে অপবিত্র করে না, তবে যদি তার গন্ধ, রং বা স্বাদ (কোনো অপবিত্র বস্তুর সংস্পর্শে) পরিবর্তিত হয়ে যায়।” [সুনান আত-তিরমিযী]
উপরোক্ত হাদিসটি পানির মৌলিক পবিত্রতা ও তার অবস্থা পরিবর্তনের মাপকাঠি।
*বিচিত্র বা মৌলিক পানি (মা মুতলাক)*
শরিয়্যাহর দৃষ্টিতে এই “মা মুতলাক” হল পবিত্রতা অর্জনের মূল মাধ্যম।
সমস্ত প্রাকৃতিক ও মৌলিক পানিকে বোঝায়, যা অন্য কোনো দ্রব্যের বিশেষণ দ্বারা সীমায়িত বা পরিবর্তিত নয়। যেমন-বৃষ্টির পানি, নদী, সমুদ্র, ঝর্ণা, কূপ ও পাহাড়ি প্রস্রবণের পানি। এই ধরনের পানির নিজস্ব পবিত্রতা রয়েছে এবং তা অন্যকে পবিত্র করার ক্ষমতা রাখে। এর গুণাগুণ (রং, গন্ধ, স্বাদ) যদি নাজাসাত বা অপবিত্র বস্তুর সংস্পর্শে এসে পরিবর্তিত না হয়ে থাকে, তবে তা দিয়ে অজু, গোসল সম্পন্ন করা এবং নাজাসাত পরিষ্কার করা সম্পূর্ণ বৈধ ।
*বিশুদ্ধ পানি (মা তাহুর)*:
“মা তাহুর” এমন পানি যা নিজে পবিত্র এবং অপরকে পবিত্র করার ক্ষমতা সম্পন্ন। এটি আবার দুটি উপশ্রেণিতে বিভক্ত:
(ক) *পবিত্রকারী পানি (মা তাহির)*: মৌলিক পানি (মা মুতলাক) যা তার পবিত্রতা ও পবিত্রকারী গুণাবলী পুরোপুরি বজায় রেখেছে। অর্থাৎ, কোনো অপবিত্র বস্তুর সংস্পর্শে আসেনি, কিংবা এসে থাকলেও তার গন্ধ, রং বা স্বাদের কোনো পরিবর্তন ঘটায়নি। ইহা শরঈ কাজে ব্যবহারের জন্য আদর্শ ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বা প্রাকৃতিক খনিজ পানি, যদিও তার স্বাদ ভিন্ন, তবুও তা মৌলিক পবিত্রতার গুণ হারায় না, তাই তা দ্বারাও পবিত্রতা অর্জন করা যায়।
(খ) *পানযোগ্য পানি (মা মুতাহাহহার)*: এটি এমন পবিত্র পানি যা পান করার জন্য উত্তম ও উপযুক্ত, কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে পবিত্রতা অর্জনের কাজে ব্যবহারের জন্য পূর্বোক্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, গোলাপজল বা পাতলা ভাবে মিশ্রিত সুগন্ধি যুক্ত পানি পান করা যেতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে অজু করা যায় কিনা তা নিয়ে ফকীহগণের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেননা, তাতে মূল পানির প্রকৃতিতে পরিবর্তন ঘটেছে বলে ধরা হতে পারে।
*পানির ব্যবহারিক বিধান ও গুরুত্ব* :
রাসূলুল্লাহ্ সাঃ এর হাদিসে বর্ণিত মাপকাঠি অনুযায়ী, যদি অপবিত্র কোনো বস্তু (যেমন প্রস্রাব, রক্ত) পানির সংস্পর্শে আসে এবং তার ফলে পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ- এই তিনটির যেকোনো একটি বৈশিষ্ট্যও স্পষ্টভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায়, তবে সেই পানি “নাজিস” বা অপবিত্র হয়ে যাবে। তখন তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা যাবে না। তবে, যদি বিশাল জলাশয় (প্রায় ১০x১০ হাত বা তার বেশি আয়তন) বা প্রবহমান নদীর পানিতে অপবিত্রতা পড়ে, কিন্তু তা পানির সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যে কোনো লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন না হয়, তবে অধিকাংশ আলেমের মতে সেই পানি পবিত্র ও পবিত্রকারীই থাকে।
এছাড়া, পানিতে যদি এমন দ্রব্য মেশানো হয় যা এর মূল প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে দেয় যেমন-চা, রস, স্যূপ বা অধিক পরিমাণে সাবান।ক্যামিকেল ও ডিটারজেন্ট যুক্ত হয়ে “পানির” স্বাভাবিক রূপ হারালে তা আর “মা মুতলাক” বা মৌলিক পানি থাকবেনা। সেক্ষেত্রে তা দিয়ে শরঈ পবিত্রতা (অজু-গোসল) অর্জন করা যাবে না, যদিও তা ব্যবহারিক বা স্বাস্থ্যকর দিক থেকে পরিচ্ছন্নতার কাজে লাগতে পারে।
ইসলামি শরিয়্যায় পবিত্রতার অন্যতম মাধ্যম বা ভিত্তি হলো বিশুদ্ধ পানি। মৌলিক প্রাকৃতিক পানি (মা মুতলাক) হল সকল প্রকার তাহারাহর প্রাথমিক মাধ্যম। পানির পবিত্রতা বা অপবিত্রতা নির্ধারিত হয় তার রং, গন্ধ ও স্বাদের পরিবর্তনের মাধ্যমে। এই সূক্ষ্ম কিন্তু স্পষ্ট বিধানগুলি মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় বিধান পালন ও শারীরিক পরিচ্ছন্নতা উভয়ই সহজ করে এবং একইসাথে পরিবেশ ও সম্পদ সংরক্ষণের প্রতি একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
উপসংহার: ইসলামে পবিত্রতার সকল স্তরই নির্ভর করে পানির সঠিক ব্যবহার ও এর মধ্যে গুণাগুণ সম্পর্কে সচেতনতার উপর। মাই মুতলাক বা মৌলিক পানির অগ্রাধিকার থেকে শুরু করে নাজাসাত দ্বারা পরিবর্তিত পানি চিহ্নিত করার সূক্ষ্ম মাপকাঠি (রং, গন্ধ, স্বাদ) পর্যন্ত এসব বিধান কেবল বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার নিয়ম নয়; বরং এগুলো আল্লাহর নির্দেশিত জীবনপদ্ধতির অনুসরণ, স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের সমর্থিত অনুশীলন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের দিকনির্দেশনা। সুতরাং, পানির এই শরঈ জ্ঞান অর্জন ও প্রয়োগ একজন মুসলিমের জন্য ঈমানি দায়িত্ব ও ইবাদাত কবুলের অন্যতম পূর্বশর্ত।