হারানো পরশ পাথর

আজিমপুরের বড়হুজুর আল্লামা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ্ রহঃ

প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও আলেমে দ্বীন, বহু গ্রন্থ লেখক ও চিন্তাবিদ, বাংলাদেশ ফোরকানিয়া-হাফেজিয়া শিক্ষক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আজিমপুর (গোরস্তান) শাহী মসজিদের সুদীর্ঘ ৫০ বছরের খাতিব বড়হুজুর

আল্লামা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ্ রহ: এর ২১তম ওফাত

দিবস। ১৯১৫ খীঃ ব্রাহ্মণবাড়ীয়া

জেলার কসবা থানার অন্তর্গত দেলী গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৩০ জানুয়ারী,

২০০৩ খ্রী: ইন্তেকাল করেন। মরহুম বড়হুজুর রহ: শৈশবেই মাতাকে হারান। পিতা মুন্সী মৌলভী মোহাম্মদ কেরামত উল্লাহ্ তৎকালীন সময়ের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন। পারিবারিক পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষাশেষে নিজ গ্রামের পার্শ্ববর্তী জামশেরপুর নিউ স্কিম মাদরাসা থেকে সেন্টার পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। অতঃপর পিতার কর্মস্থল ঢাকায় এসে ইসলামিক ইন্টামিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে কবি নজরুল সরকারী কলেজ) থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পিতার ইন্তেকালের পর কুল কিনারা হারিয়ে গ্রামে চলে যান। সেখানে একজন শুভাকাঙ্খী তাঁকে মাদরাসায় ভর্তি হতে অনুপ্রাণিত করেন এবং বংশীয় চাচাত ভাই ডাঃ আবু নাছের মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদের অভিভাবকত্বে জামেয়া ইউনুসিয়া, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় ভর্তি হন। সেখান থেকে ঢাকায় এসে আশরাফুল উলুম (বড়কাটারা) মাদরাসায় ভর্তি হন। অতঃপর তিনি উচ্চশিক্ষার্থে ভারতে গমণ করেন-সেখানে দারুল উলুম দেওবন্দ, জামেয়া ইসলামিয়া ডাভেল (সুরাট) ও সাহরানপুর মাজাহিরুল উলুম মাদরাসায় শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করেন। দেশে তাঁর উন্তাযবৃন্দের মধ্যে জামেয়া ইউনুসিয়ায় ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার বড় হুজুর হযরত মাওলানা সিরাজুল ইসলাম, আশরাফুল উলুম বড় কাটারা মাদরাসায় হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর, আবদুল ওয়াহহাব পীরজী হুজুর, মাওলানা তফাজ্জল হোসাইন, মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ্ ও মাওলানা সাওয়াব আলী চৌধুরী রাহিমাহুল্লাহর কাছে বিভিন্ন কিতাব অধ্যয়ন করেন। ভারতের দেওবন্দ, ডাভেল ও সাহরানপুরে আল্লামা শাব্বির আহমাদ উসমানী, শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া, আবদুর রহমান কামেলপুরী রহিমাহুল্লাহর কাছে হাদীস শাস্ত্রের অনন্য গ্রন্থাবলী-বুখারী, আবু দাউদ ও তিরমিযি অধ্যয়ন করেন।

তিনি আশরাফুল উলুম বড় কাটরা মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন পরবর্তীতে লালবাগ মাদরাসা, তাঁতী বাজার ইসালমিয়া মাদরাসা, ফরিদাবাদ মাদরাসা, দেওভোগ মাদরাসা-নারায়নগঞ্জ, মাদরাসা নূরিয়া-কামরাঙ্গিরচর, লালমাটিয়া মাদরাসাসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্বীন-ই-ইলম শিক্ষাদানের মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। বড়হুজুর রহ: ১৯৭৫ খ্রী: ঢাকায় ‘মাদরাসা ফয়জুল উলুম আজিমপুর’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সমসাময়িক শিক্ষা ও সমাজ ব্যবস্থার উপর বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামামের মক্কা বিজয় (ফতেহ মক্কা), সমাজতান্ত্রিক বিভীষিকার অন্তরালে বাংলাদেশের মুসলমান, অগ্নিপরীক্ষা, Quoran Based Education Need of the Day, ইতিহাসের
আলোকে আত্মকলহের ভয়াবহ পরিণাম (সমাপ্ত আকারে প্রকাশের পথে), চাঁদ দেখা (মূল: রুবাইয়াত-ই হিলাল-মুফতী মুহাম্মদ শফি), শাহাদাতুল আকুওয়াম আলা সিদকুিল ইসলাম (মূল: হাকীমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ:) অন্যতম। তিনি সারাদেশে ওয়াজ-মাহফিল ও নসিহত-দ্বীনি জলসার মাধ্যমে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে অনবদ্য অবদান রাখেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া ওয়াজ-মাহফিল পূণঃপ্রচলন করেন এবং তিনিই প্রথম সাহস করে কোরআনের মাহফিলের আয়োজন করেন। তাঁর জ্বালাময়ী বক্তব্যে সারাবিশ্বের অবহেলিত মুসলিম ভাইদের করুণ আর্তনাদ প্রকাশ পেত। মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা ও আবেদন, ইসলামের রাজনৈতিক স্বরূপ বিশ্লেষণ এবং কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক নিখাদ দ্বীনদর্শণ ও দ্বীন কায়েমের অনিবার্যতা নিয়ে তিনি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা পেশ করতেন।

আর্ত মানবতার সেবায় ও দুঃস্থজনদের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ মহান ব্যক্তি হিসাবে তিনি বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছাস এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগে আক্রান্ত মানুষের পাশে সর্বস্ব নিয়ে আত্মনিয়োগ করার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। ১৯৭৮ খ্রী: মায়ানমার থেকে বিতাড়িত কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি সারাদেশে মাসজিদ, মাদরাসা, মক্তব ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাসজিদ ও মাদরাসাসমূহ দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।

মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রক্রিয়ার পূণরুত্থান ও মুসলিম জাতিত্ত্বার সুপ্ত চেতনা জাগিয়ে তুলতে তিনি সচেষ্ট ছিলেন। ইসলাম প্রচার সমিতি, মসজিদ মিশন ও ইত্তেহাদুল উম্মাহ প্রতিষ্ঠায় তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমগণের ছাত্র ও বাংলাদেশের বড় বড় উলমা-মাশায়েখগণের উস্তায এবং তাঁর সমকালীন একজন অন্যতম আকাবীরে দ্বীন হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল- প্রচার বিমুখতা, আড়ম্বরহীন ও অতি সাধারণ জীবন যাপন। সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সমাদৃত ও শ্রদ্ধার পাত্র। তাঁর জীবন ও কর্ম সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি ও ঐক্যের পথ দেখাতে পারে।

আরো