নগদ-এ অতিরিক্ত ই-মানি ও অর্থ পাচার নাটকের রূপকার গভর্নর মনসুর
জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নগদকে ধ্বংস করার যেসব প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নিয়েছিলেন তার মধ্যে প্রধান ছিল আর্থিক কেলেঙ্কারিতে নগদের নাম যুক্ত থাকার গালগল্প তৈরী করা। সে অনুসারে গভর্নরের দিকে প্রপাগান্ডা তৈরী করা এবং তার যথেষ্ট প্রচার প্রচারণাও করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের দশ দিনেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পান ড. আহসান এইচ মনসুর। শুরু থেকেই গালগল্প তৈরীর কৌশল নিয়ে এগুতে থাকেন তিনি। বিতর্কের সবচেয়ে বড় জায়গা তিনি তৈরী করতে থাকেন নগদকে জড়িয়ে। নগদের কাছে জমা থাকা অর্থের চেয়ে অনেক বেশী ই-মানি সৃষ্টি করা হয়েছে এবং বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে – এটি ছিল তার অন্যতম কল্পিত গল্প।
এসব গল্পের ভিত্তিকে আরো শক্ত করতে নগদ অফিসে টেলিভিশনের ক্যামেরাসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের লোকদের পাঠানো বা বাংলাদেশ ব্যাংককে দিয়ে নগদ লিমিটেডের শেয়ার হোল্ডারদের নামে বেশ কিছু মামলাও দেয়া হয়। তাছাড়া বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটের মাধ্যমে নগদের শীর্ষ পদের কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসেব জব্দ করাও এই নাটকেরই বিভিন্ন অংশ বলে মনেকরেন সংশ্লিষ্টরা। মামলা হয় সেখানেও।
সংশ্লিষ্ট অনেকেই তখন বলেছেন, নগদের মালিকদেরকে আইনগত প্যাচে ফেলে এই সুযোগে উচ্চ সম্ভাবনার এই প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করা, নয়তো অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেওয়ার পায়তার অংশ হিসেবেই ড. মনসুর এসব গল্প তৈরী করেন।
২৩’শ কোটি টাকার ‘অনিয়ম’ চক্রান্ত
ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পান ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট। আর আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ২১ আগস্ট নগদে প্রশাসক নিয়োগ করেন তিনি। প্রশাসক দল নগদে এসেই তথাকথিত অনিয়ম খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরে তারা মনগড়া দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি কল্পিতগল্প তৈরী করেন। গত দেড় বছর ধরে আহসান এইচ মনসুর এই দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকার গল্পই বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমসহ সকলকে বলে বেড়িয়েছেন। ফলে নগদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে যথেচ্চার।
প্রশাসক দল নগদে এসেই ই-মানির ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু নগদ কর্তৃপক্ষ সব সময়ই দৃঢ়ভাবে বলছে, নগদে কখনো ই-মানির কোনো ঘাটতি ছিল না। বরং আইনীগত বৈধ ঋণকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে ই-মানির ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করে ফায়দা লোটার চেষ্টা হয়েছে।
নগদের এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৯ সালে নগদ কর্তৃপক্ষ এক্সিম ব্যাংকে থাকা তাদের ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে ৩৪৫ কোটি টাকা ঋণ নেয়। সে সময় ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্টে জমা থাকা অর্থের বিরপরীতে ঋণ নেওয়ার বিধান বিদ্যামান ছিল। পরে অবশ্য এই বিধানটি বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট হল ব্যাংকের এমন একটি অ্যাকাউন্ট যেখানে মোবাইল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো টাকা জমা দেওয়ার বিপরীতে ই-মানি তৈরী করে। আর এই ই-মানিকেই ব্যাবহার করে এমএফএস-এর সকল লেনদেন সংগঠিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে ঋণ নেওয়ার বিধানটি বাতিল করলে সঙ্গে সঙ্গে এক্সিম ব্যাংক নগদের ঋণ সমন্বয় করে ফেলে। ফলে নগদের ই-মানির একটি সাময়িক ঘাটতি তৈরী হয়। বিষয়টি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নগদ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকে গেলে এই ঘাটতি পূরণের জন্যে কয়েকটি কিস্তি করে দেওয়া হয়। সে অনুসারে নগদ অর্থ পরিশোধও করে আসছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক যখন নগদ দখল করে তখনো ২৩ কোটি এবং ২০ কোটি টাকার দুটো কিস্তি পরিশোধ বাকি যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মধ্যে পরিশোধ করার কথা। পরে এটাই সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন আহসান এইচ মনসুর।
প্রশাসক দল নিয়োগ পেয়ে তারাই বরং ব্যাংকে চিঠি দিয়ে শেষ দুটি কিস্তি পরিশোধ বন্ধ করে দেয়। ফলে খেলাপী হয়ে যায় নগদ। আর এটাকেই ই-মানির ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করার সুযোগ পায় আহসান এইচ মনসুর ও তার দল।
অতিরঞ্জিত এসব গালগল্প তিনি এমনভাবে বিভিন্ন জায়গায় উপস্থাপন করেন যে গ্রাহকের আস্থা নগদের ওপর থেকে একেবারে উঠে যায়।
অডিট করতে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির অডিটর
নিজেরা ২৩’শ কোটি টাকার আষাঢ়ে গল্প তৈরী করার পর আবার ফরেনসিক অডিট করানোর জন্য অডিটর নিয়োগ করে। এক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানকে অডিটর হিসেবে নিয়োগ করা হয়, দেখা গেছে গত এক যুগ ধরে ওই একই কোম্পানি নগদের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেছে।
ফরেনসিক নিরীক্ষা হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত খতিয়ে দেখা, যার মাধ্যমে যেকোনো জালিয়াতি ও অনিয়ম থাকলে বের করা সম্ভব। বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ফরেনসিক নিরীক্ষা তেমন দেখা যায় না। তারপরেও নগদ শুরুতে অডিট করাকে স্বাগত জানালেও এক পর্যায়ে দেখা যায় অডিটের নামে কোম্পানিটি গ্রাহকেদের স্পর্শকাতর আর্থিক তথ্য তছনছ করছে। চক্রান্ত বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জানা গেছে, অডিটর কোম্পানি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে অডিটে যেহেতু আহসান এইচ মনসুর চাহিদামতো তথ্য আসেনি ফলে সেটি প্রকাশও করেনিনি বা এবিষয়ে তিনি আর কোনো কথা তিনি কখনো বলেননি। তবে ভুয়া এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নগদের বেশ কয়েক জন শেয়ার হোল্ডারের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। কিন্তু যে তথ্যের কোনো ভিত্তি নাই সে মামলা তো বেশী দূর এগুতে পারে না। সে কারণে বিষয়টি এক রকম চাপা পড়েই আছে। তবে নগদের শেয়ার হোল্ডারদেরকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেই এ মামলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র।
অবৈধভাবে বিক্রির চেষ্টা
নানান প্রক্রিয়ায় চক্রান্ত করতে গিয়ে যখন তিনি একে একে ব্যর্থ হয়েছেন তখনই নগদকে বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন আহসান এইচ মনসুর। এ প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মাধ্যমে দরপত্র আহবান করা হয়। তবে সেখানেও বাঁধা হয়ে আসে আদালতের রায়। পুরো প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে আদালত। গত বছর ১১ সেপ্টেম্বর আদালতের এই আদেশের পর কিছু দিন সব চুপচাপ থাকলেও সম্প্রতি আবার বিষয়টি নিয়ে সরগরম হয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, আহসান এইচ মনসুর জানতেন যে গভর্ণর হিসেবে তার সময় শেষ হয়ে এসেছে। সে কারণে দ্রুততার সঙ্গে তার মূল্ অ্যাসাইনমেন্টগুলো শেষ করে যেতে চেয়েছেন তিনি। বিকাশকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া এবং নগদকে বিক্রি করে দেওয়াকেই তিনি তার প্রধানতম অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে নেন। কিন্তু শেষ রক্ষ্মা আর তার হয়নি।
সব প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হতে চলেছে তখন চুপিসারে একটি মহলের সঙ্গে কাজ করতে থাকেন তিনি। পরে জানা যায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম বা ব্যারিস্টার আরমানের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেন তিনি। সে অনুসারে আরমান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর বরাবর চিঠিও লেখেন। সম্প্রতি বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে সোরগোল উঠলে ড. মনুসুরের বিদায় আসন্ন হয়ে ওঠে।
এসব বিষেয়ে অর্থনীতি বিষয়ক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নগদ নিয়ে গত দেড় বছরে যা যা বলেছেন আর যা করেছেন তার সঙ্গে মিল খুব একটা পাওয়া যায় না। বরং তিনি এমন কিছু কাজ করেছেন যা হীনমন্য আচরণ আর ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। উদীয়মান একটি কোম্পানিকে গভর্নরের মতো চেয়ার থেকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হবে – এটা তো চিন্তারও বাইরে। কিন্তু সেটাই ঘটেছে।