সাওমের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ বছরব্যাপী প্রতিপালনের সংকল্প

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

সিয়াম (صِيَام) আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো বিরত থাকা, আত্মসংযম বা উপবাস করা। এটি ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ এবং আত্মশুদ্ধির অন্যতম মাধ্যম, যা কুরআন ও হাদীস দ্বারা ফরজ সাব্যস্ত হয়েছে।
শরীয়তের পরিভাষায়, সুবহে সাদিক (ভোর) থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট নিয়তের সাথে সাওম ভঙ্গকারী সব কাজ (পানাহার, যৌনমিলন ও পাপাচার) থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম।
সাওমের (রোজা) মূল শিক্ষা হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহানুভূতি, সততা এবং আল্লাহর ভীতি (তাকওয়া) অর্জন। বাস্তব জীবনে এই শিক্ষা প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ কু-প্রবৃত্তি ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকতে পারে। এর মাধ্যমে ধৈর্য্য, একতা, ন্যায়পরায়ণতা, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন এবং অপরের দুঃখে সহানুভূতিশীল হওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়, যা একটি সুন্দর ও শান্তিময় ভ্রাতৃত্ববোধের সমাজ বিনির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাওমের কিছু শিক্ষা নিচে উল্লেখ করা হলো:
*আত্মনিয়ন্ত্রণ ও তাকওয়া অর্জন*: সাওম মানুষকে লোভ-লালসা ও নফসের খায়েশাত (কু-প্রবৃত্তি) থেকে বিরত থাকতে শেখায়। বাস্তব জীবনে মিথ্যা বলা, গীবত করা, হারাম উপার্জন ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে এই শিক্ষা বাস্তবায়ন করা যায় ।
*সহানুভূতি ও দানশীলতা*: ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করে দরিদ্র ও অভাবী মানুষের প্রতি সহমর্মিতা বোধ জাগ্রত হয়। সমাজে অভাবী ও অসহায় মানুষদের সাহায্য করা এবং অপচয় রোধ করার অভ্যাস গড়া, যা রমজানের শিক্ষার অন্যতম অংশ।
*শৃংখলা ও সময়ের সঠিক ব্যবহার*: সাহরি ও ইফতারের নির্দিষ্ট সময়ের মাধ্যমে জীবনে শৃঙ্খলা ও সময়ের সঠিক ব্যবহার শেখা যায়। ব্যক্তিগত ও কর্মক্ষেত্রে সময়ের নিষ্ঠা ও দায়িত্ব পালনে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
*সচ্চরিত্র ও ধৈর্যের বিকাশ*: সাওম পালনকারীকে রাগ নিয়ন্ত্রণ ও ক্রোধ বর্জন করতে হয়। বাস্তব জীবনে ধৈর্য ধারণ করা এবং সচ্চরিত্রের অধিকারী হওয়ার মাধ্যমে এই শিক্ষা জীবনে প্রয়োগ করা সম্ভব।
*সততা ও নৈতিকতা*: সাওম মানুষকে ঢালের মতো পাপ কাজ থেকে রক্ষা করে। এটি সততা ও নৈতিকতার মাধ্যমে হালাল উপার্জনে উদ্বুদ্ধ করে।
*সাওম কেন ফরয করা হয়েছে*:
সাওম কেবল আমাদের উপরই ফরজ নয় । বরং পূর্বের সকল নবি-রাসুলের উম্মতের উপরও ফরজ ছিল। এর মাধ্যমে সাওম পালনকারীর আত্মিক উৎকর্ষ সাধিত হয় । সাওমের মাধ্যমে মানুষের মনে তাক্বওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করে। নফসের প্ররোচনায় মানুষ লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ-ক্ষোভ ও কামভাবের বশবর্তী হয়ে অনেক মন্দ কাজে লিপ্ত হয়। সাওম’ মানুষকে এসব কাজ থেকে মুক্ত থাকতে শেখায় । ‘সাওম’ কোনো ব্যক্তি ও তার মন্দ কাজের মাঝে ঢাল (প্রতিবন্ধক) হিসাবে কাজ করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেছেন, সাওম ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তাঁর নিজের জন্য, কিন্তু সিয়াম আমার জন্য। তাই আমি এর প্রতিদান দিব। সিয়াম (বান্দার জন্য) ঢাল স্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন সিয়াম পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাঁকে গালি দেয় অথবা তাঁর সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি একজন রোযাদার। যার কবজায় মুহাম্মাদের প্রাণ, তাঁর শপথ! অবশ্যই রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ্‌র নিকট মিশকের সুঘ্রানের চাইতেও উত্তম। রেযাদারের জন্য রয়েছে দু’টি খুশীর সংবাদ- (১) যখন সে ইফতার করে, সে খুশী হয় এবং (২) যখন সে তাঁর রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন সওমের বিনিময়ে আনন্দিত হবে। [সহিহ বুখারী-১৯০৪]
*সাওমের সামাজিক শিক্ষা*
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন,”এ মাস সহানুভুতির মাস ।” [ইবনে খুযায়মা]
সিয়াম সাধনের ফলে সমাজের লোকদের মাঝে পারস্পারিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা সৃষ্টি হয় । সাওম পালন করে এরূপ ব্যক্তি ক্ষুধার্ত থাকার ফলে সে অন্য আরেকজন অনাহারীর ক্ষুধার জ্বালা সহজে বুঝতে পারে । ক্ষুধা ও পিপাসার যন্ত্রণা সে উপলব্ধি করতে পারে । এতে অসহায় নিরন্ন মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার ভাব জাগ্রত হয়।
*মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সাওম*
বর্তমান বিশ্বে চলমান যুদ্ধবিগ্রহ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত, বিশ্ববাসীকে চরম শঙ্কার মুখে ফেলেছে। এই যুদ্ধের ভয়াবহতা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, যা রেকর্ড খাদ্য সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করেছে। মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ শক্তির স্থলে আজ আমরা বহুধারায় বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন। সাওম বা রোজা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির একটি শক্তিশালী মাধ্যম। যা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলকে একই রুটিন এবং সময়ে (সাহরি ও ইফতার) অভ্যস্ত করে সাম্যের শিক্ষা দেয় । এটি পারস্পরিক সহানুভূতি, ধৈর্য এবং শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত করে, যা উম্মাহর অভ্যন্তরীণ বিভেদ দূর করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে সাহায্য করে।
সাওমের মাধ্যমে অর্জিত এই শিক্ষাগুলো শুধু রমজান মাসে নয়, বরং সারা বছর ধরে বজায় রাখাই হলো প্রকৃত সিয়াম সাধনা।

আরো