ভুয়া পরিচয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকার মনোরেল চুক্তি, বাতিলে বাধ্য হলো চসিক
চট্টগ্রাম নগরীতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) শেষ পর্যন্ত বাতিল করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। মিসরের খ্যাতনামা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন’ ও ‘দ্য আরব কন্ট্রাক্টরস’-এর প্রতিনিধি পরিচয়ে চসিকের সঙ্গে চুক্তি করা কাউসার আলম চৌধুরী প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠান দুটির কোনো অনুমোদিত প্রতিনিধি নন বলে ঢাকাস্থ মিশরীয় দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে জানালে, এ সিদ্ধান্ত নেয় চসিক।
বুধবার (২৫ জুন) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে কাউসার আলম চৌধুরীর সঙ্গে স্বাক্ষরিত মনোরেল প্রকল্প-সংক্রান্ত এমওইউ ও সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র বাতিল করা হয়।
চসিক সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১ জুন ‘আরব কন্ট্রাক্টরস ও ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’-এর পক্ষে দাবি করে কাউসার আলম চৌধুরী চসিকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
পরে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই ও বাস্তবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সহযোগিতাও চাওয়া হয়। পরে বিষয়টি বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের আলোচনাতেও স্থান পায়।
তবে গত ২২ জুন মিশরীয় দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিডাকে জানান, কাউসার আলম চৌধুরীর সঙ্গে ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন বা দ্য আরব কন্ট্রাক্টরসে’র কোনো প্রতিনিধিত্বমূলক, চুক্তিভিত্তিক বা অনুমোদিত সম্পর্ক নেই। তিনি প্রতিষ্ঠান দুটির পক্ষে কোনো আলোচনা, চুক্তি স্বাক্ষর কিংবা প্রকল্প প্রচারেরও অনুমোদনপ্রাপ্ত নন। দূতাবাসের ওই বার্তা পাওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি চসিককে অবহিত করে এবং পরদিনই চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বিশ্বখ্যাত দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে একটি চক্র মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়, অথচ তাদের কাছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ অনুমোদনপত্র, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা প্রতিনিধিত্বের আইনগত নথি ছিল না।
অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, কথিত ‘আরব কন্ট্রাক্টরস-ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’-এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা শুধু চট্টগ্রামের মনোরেল প্রকল্প নয়, খুলনায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ও মোংলা বন্দরে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়েও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
মনোরেল প্রকল্প ঘিরে আলোচনায় এসেছে গ্রেটার চিটাগাং ইকোনমিক ফোরামের নামও। সংগঠনটির সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, যিনি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাই। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সভা, বৈঠক ও অনুষ্ঠানে তাকে সক্রিয়ভাবে দেখা গেছে। একই সংগঠনের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আলোচিত আলী নাজির শাহীন। ফলে প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। তবে আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর ভূমিকা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
চসিকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মনোরেল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে এমওইউ করা হয়েছিল এবং এতে সিটি করপোরেশনের কোনো আর্থিক ব্যয় হয়নি। তবুও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ায় শেষ পর্যন্ত পুরো চুক্তিই বাতিল করা হয়েছে।