সাবেক জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের কর্মকর্তার দুর্নীতি (পর্ব-৫)

শহিদুলের বিশাল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব, শীঘ্রই সম্পন্ন হচ্ছে ‘পাওয়ার’ প্রক্রিয়া

স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য শহিদুল ইসলামের হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও আন্তর্জাতিক জালিয়াতির শিকড় কত গভীরে, তা এবার সরেজমিনে অনুসন্ধানে নেমে প্রামাণ্যভাবে উন্মোচিত হয়েছে। গত পর্বে রাজউকের পূর্বাচল সংলগ্ন আমেরিকান সিটিতে শহিদুল ইসলামের ১০৪ কাঠা মূল্যবান জমির যে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছিল, এবার সরেজমিনে গিয়ে তার শতভাগ সত্যতা পাওয়া গেছে। ওই আবাসন প্রকল্পের সাইট অফিসে গিয়ে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি শহিদুল ইসলামের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করেছেন। তবে এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় ও বিস্ফোরক তথ্যটি বেরিয়ে আসে কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার এক পর্যায়ে। সাইট অফিসে কর্মরতরা অকপটে জানান যে কেবল শহিদুল ইসলামই নন, এই একক আবাসন প্রকল্পেই সরকারের রাজস্ব বোর্ডের সাবেক এবং বর্তমান একশ’রও বেশি শীর্ষ কর্মকর্তার নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ প্লট ও সম্পদ রয়েছে, যা মূলত দুর্নীতির টাকায় কেনা।

​এদিকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে বিলাসবহুল হোটেলে সপরিবারে অবস্থান করা শহিদুল ইসলামকে আইনি জালে জড়ানোর আগেই তার দেশীয় সিন্ডিকেটকে কাজে লাগিয়ে সমস্ত সম্পদ বিক্রির চেষ্টা আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে। তার পুরাতন বা পেছনের তারিখ দেখিয়ে সহযোগীদের নামে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা লিখে দেওয়ার গোপন মিশনটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা ইতোমধ্যে শহিদুল ইসলামের গোপন ডেরায় পৌঁছে গেছে। যেহেতু বিশাল এই সাম্রাজ্য যেমন ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ি একসাথে উপযুক্ত ক্রেতা খুঁজে বিক্রি করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন, তাই শহিদুল ইসলাম আপাতত এশিয়ারই কোনো একটি নিরাপদ দেশে অবস্থান করছেন। এর মূল কারণ হলো সম্পদ বিক্রির সহযোগী সিন্ডিকেট ও সম্ভাব্য বড় ক্রেতাদের সাথে যেন যেকোনো মুহূর্তে সরাসরি বা গোপনে সাক্ষাৎ করা সহজ হয় এবং সম্পদ বিক্রির শত শত কোটি টাকা অতি সহজে ও নিরাপদে পরিচিত আন্তর্জাতিক হুন্ডির চ্যানেলে পাচার করা যায়।

এর আগে অনুসন্ধানে তার ছোট ছেলে হাসিন ফারহানের নামে বসুন্ধরার বিলাসবহুল জেসিএক্স বিজনেস টাওয়ারে রাজকীয় অফিস খুলে ভেলোসিটি গ্রুপের অধীনে মাল্টিপল এজেন্সির মূল পুঁজি হিসেবে নগদ পাঁচ কোটি টাকা প্রদানের তথ্য উঠে এসেছিল। সেই সূত্রের ধারাবাহিকতায় কয়েকদিন আগে আমরা গিয়েছিলাম হাসিন ফারহানের ভেলোসিটি আইটি ফার্মের অফিসে, সেখানে কথা হয়েছিল তাসিন ফারহানের ব্যবসায়িক পার্টনার তাহির হাসানের সঙ্গে। কথা বলে আসার পরে সহযোগিতার পরিবর্তে তিনি আমাদের ফোন নম্বর ব্ল্যাকলিস্টে দিয়ে রাখেন, যা এই দুর্নীতিবাজ চক্রের তথ্য গোপনের মরিয়া চেষ্টাকেই প্রমাণ করে।

​আমেরিকান সিটির ১০৪ কাঠা জমির পাশাপাশি শহিদুলের পূর্বের সমস্ত দৃশ্যমান ও গোপন সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্যও এখন এই জালিয়াতি চক্রের মাধ্যমে বিক্রির তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকে ১০০ কোটি টাকা মূল্যের ‘শেল কবিতা’ নামক ২০টি ফ্ল্যাটের পুরো ১০তলা ভবন এবং বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারের দুটি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট। এছাড়া শাহবাগ ও নিউমার্কেটের চার কোটি টাকার দোকান, মিরপুর আরামবাগ আবাসিক এলাকায় স্ত্রীর নামে থাকা ৩০ কোটি টাকার ভবন এবং চার শ্যালকের নামে কাগজে-কলমে হস্তান্তর করা ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ২০টি ফ্ল্যাটও এই আমমোক্তারনামা জালিয়াতির মাধ্যমে তাড়াহুড়ো করে নগদায়নের চেষ্টা চলছে। সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের ৩৫ কাঠার রাজকীয় লাল ইটের বাংলোবাড়ি ‘সেঁজুতি’ এবং ৩২০ কাঠার পাঁচটি বিশাল বাণিজ্যিক প্লট ও খামার, যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা, সেগুলোও বিক্রির তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে। এমনকি রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্প, ডুমনি মৌজার পিংক সিটি, পিতলগঞ্জ, দিঘলিয়া, বাড়িয়াছনি ও গাজীপুরের কালিগঞ্জে থাকা শত বিঘা মূল্যবান জমিও বিক্রি করে সেই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে এশিয়ায় শহিদুলের কাছে পাঠানোর ছক চূড়ান্ত করা হয়েছে। এনবিআরের সাবেক এবং বর্তমান একশ’র বেশি কর্মকর্তার এই বিশাল আখড়া এবং শহিদুলের আন্তর্জাতিক পলায়ন এখন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।

আরো