বিকাশ হাজারে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়া বিকাশ ১৮. ৫০ পয়সা থেকে কমিয়ে মানুষের সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসবে। কিন্তু কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত তা করেনি করার চিন্তা ভাবনাও নেই। নগদ যদিও বিকাশের চেয়ে অনেক কম রেখেছে, কিন্তু দেশের বৃহত্তম প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে বিকাশ সর্বপ্রথম, সেক্ষেত্রে মানুষের চাওয়া বিকাশের প্রতি অনেক বেশি। কিন্তু তা না করে কোম্পানিটি তাদের নীতিই ধরে রেখেছে, ক্যাশ আউট ১৮ টাকা ৫০ পয়সা, এবং সেন্ড মানিতে কাটা হয় ৫ টাকা। কিছু দিন আগে কেটেছিল সেন্ড মানিতে ১০ টাকা। বিকাশ এবং নগদ দুটি কোম্পানি প্রবাসী আয় থেকে শত শত কোটি টাকা ইনকাম করছে। দেশের আনাচে-কানাচে বেশিরভাগ মানুষ বিকাশ এবং নগদের সাথে জড়িত অথচ এই বিকাশ এখন পর্যন্ত গন মানুষের চাহিদা পূরণ করেনি। চাহিদা পূরণ করছে অতিরিক্ত মুনাফা রেখে।

শ্রমজীবী মানুষের ঘামে-শ্রমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা আয় যাকে বলা হয় (প্রবাসী) বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সেই রেমিট্যান্স এখন শুধু ব্যাংকিং চ্যানেলেই সীমাবদ্ধ নেই, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমেও দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিবারের হাতে। এ ব্যবস্থায় সবচেয়ে শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি বিকাশ।
প্রশ্ন উঠছে দেশের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেন যখন ক্রমেই একটি-দুটি বড় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে পড়ছে, তখন বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি কতটা প্রতিযোগিতামূলক, নিরাপদ ও বহুমুখী? বিশেষ করে রেমিট্যান্স, ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট, মার্চেন্ট পেমেন্ট, বিল পরিশোধ, সঞ্চয় ও ঋণ,একই প্ল্যাটফর্মে এতগুলো সেবা কেন্দ্রীভূত হওয়া ভবিষ্যতে কোনো ঝুঁকি তৈরি করবে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
দেড় দশকে বিশাল সাম্রাজ্য
২০১০ সালে কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে বিকাশ; বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের পর ২০১১ সালে এমএফএস কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। শুরুতে মোবাইলের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর সহজ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত হলেও সময়ের সঙ্গে এর সেবা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিকাশের আয় হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা হয়েছে ৬৬১ কোটি টাকা। ২০২২ সালে যেখানে নিট মুনাফা ছিল মাত্র ১৭ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৯৮ কোটি এবং ২০২৪ সালে ৩১৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে মুনাফায় বড় ধরনের উল্লেখযোগ্য ঘটেছে ঘটেছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ভেরিফায়েড নিবন্ধিত গ্রাহক ছিল ৮ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে শেষ তিন মাসে লেনদেন করেছেন প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহক। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নেটওয়ার্কে সাড়ে ৩ লাখের বেশি এজেন্ট পয়েন্ট এবং প্রায় ১০ লাখ মার্চেন্ট রয়েছে।
এত বড় গ্রাহকভিত্তি ও এজেন্ট নেটওয়ার্কের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ‘মোবাইলে টাকা’ বললেই বিকাশের নাম চলে আসে। এখানেই তৈরি হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা—ডিজিটাল লেনদেনের বড় একটি অংশ একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
প্রবাসীর রেমিট্যান্সও বড় অংশের ডিজিটাল প্রবাহ
প্রবাসী বাংলাদেশিরা বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশ থেকে ১৩৫টি আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার অপারেটরের মাধ্যমে বিকাশ অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন। এসব রেমিট্যান্সের সেটেলমেন্ট হচ্ছে দেশের ২৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে।
অর্থাৎ বিদেশে থাকা একজন বাংলাদেশি বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর পর তা দ্রুত পরিবারের সদস্যের মোবাইল ওয়ালেটে পৌঁছে যেতে পারে। বিকাশের তথ্য অনুযায়ী, বৈধ চ্যানেলে পাঠানো রেমিট্যান্সে সরকার নির্ধারিত ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—প্রবাসীর পাঠানো পুরো অর্থ বিকাশের আয় নয়। রেমিট্যান্সের মূল অর্থ গ্রাহকেরই থাকে এবং ব্যাংকিং ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্য দিয়ে তা দেশে আসে। তবে এত বড় রেমিট্যান্স প্রবাহ একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের গ্রাহকসংখ্যা, লেনদেনের পরিমাণ ও ব্যবসায়িক পরিধি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাহলে ‘বিকাশের সাম্রাজ্য’ কোথায়?
বিকাশ শুধু টাকা পাঠানো বা টাকা তোলার প্ল্যাটফর্ম নয়। এর অ্যাপের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সেবা, সঞ্চয় ও ডিপিএস, ডিজিটাল ঋণ, মার্চেন্ট পেমেন্টসহ বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এর অ্যাপ ব্যবহার করে চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৬০ লাখের বেশি সঞ্চয়ী বা ডিপিএস হিসাব খোলা হয়েছে। একইভাবে একটি ব্যাংকের মাধ্যমে বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার করে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি ডিজিটাল ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
ফলে বিকাশের ভূমিকা এখন কেবল ‘মোবাইল ওয়ালেট’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এটি ক্রমে বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে পরিণত হচ্ছে।
মালিকানার কাঠামোতেও আন্তর্জাতিক অংশীদার
বিকাশকে শুধুই দেশীয় মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠানটি ব্র্যাক ব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রের Money in Motion, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান IFC, Gates Foundation, Ant International এবং SoftBank-এর অংশীদারিত্বে পরিচালিত হচ্ছে বলে বিকাশের নিজস্ব ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন।
অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের অন্যতম বৃহৎ প্ল্যাটফর্মটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। এটি একদিকে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি করেছে; অন্যদিকে দেশের ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রভাব নিয়েও নীতিনির্ধারকদের নজর রাখা প্রয়োজন।
‘জিম্মি’ হওয়ার ঝুঁকি কোথায়?
বিকাশ বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কারণে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ‘জিম্মি’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো তথ্য এখানে নেই। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত বাজারে প্রতিযোগিতা ও বিকল্প ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী কি না।
একটি প্ল্যাটফর্মে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক, এজেন্ট ও মার্চেন্ট নির্ভরশীল হয়ে গেলে কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রথমত, সিস্টেম-নির্ভরতা। বড় কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা, সাইবার হামলা, সার্ভার বিভ্রাট বা দীর্ঘ সময়ের সেবা বিঘ্নিত হলে বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে সমস্যায় পড়তে পারেন।
দ্বিতীয়ত, বাজার প্রতিযোগিতা। বিকাশ, নগদ, রকেটসহ একাধিক এমএফএস প্রতিষ্ঠান থাকলেও গ্রাহক ও লেনদেনের ঘনত্ব যদি একটি প্ল্যাটফর্মের দিকে অতিরিক্ত চলে যায়, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা নিয়ন্ত্রকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, লেনদেনের খরচ। ক্যাশ-আউট বা অন্যান্য সেবার চার্জ গ্রাহকের ওপর কতটা চাপ তৈরি করছে, সেটিও নিয়মিত পর্যালোচনার বিষয়।
চতুর্থত, ডেটা সুরক্ষা। কোটি কোটি মানুষের আর্থিক লেনদেনের তথ্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জমা হচ্ছে। এসব তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং কে কোন তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে পারবে—এগুলো ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি।
শুধু বিকাশ নয়, শক্তিশালী হতে হবে পুরো ডিজিটাল অর্থনীতি
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নিজেই সমস্যা নয়। বরং একটি দেশীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফল হওয়া অর্থনীতির সক্ষমতারই প্রমাণ হতে পারে।
সমস্যা তখনই তৈরি হতে পারে, যখন একটি প্রতিষ্ঠান এতটাই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে তার বিকল্প তৈরি করা কঠিন হয়ে যায়, অথবা গ্রাহকরা ন্যায্য খরচে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার সুযোগ হারান।
তাই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—এমএফএস খাতে সমান প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা বাড়ানো, গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা জোরদার করা, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং লেনদেনের খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা।
একই সঙ্গে ব্যাংক, এমএফএস, ফিনটেক ও অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মধ্যে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো একক প্রতিষ্ঠান নয়—গ্রাহকই হবে বাজারের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রবাসীর টাকা কার জন্য?
প্রবাসীর পাঠানো প্রতিটি ডলার মূলত দেশের অর্থনীতিতে পরিবার, ব্যবসা ও ভোগব্যয়ের মাধ্যমে প্রবাহিত হওয়ার জন্য। সেই অর্থ ডিজিটাল মাধ্যমে দ্রুত ও নিরাপদে পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়া অবশ্যই ইতিবাচক।
কিন্তু রেমিট্যান্সের অর্থ যে প্ল্যাটফর্ম দিয়ে দেশে আসছে, সেই প্ল্যাটফর্ম কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, তার বাজারক্ষমতা কতটা বাড়ছে এবং এর ওপর দেশের আর্থিক অবকাঠামোর নির্ভরতা কতটা তৈরি হচ্ছে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ‘প্রবাসীর টাকায় বিকাশের সাম্রাজ্য’—এই শিরোনামটি মূলত একটি বড় প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে: বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি কি কয়েকটি বড় প্ল্যাটফর্মের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?
এর উত্তর এখনই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে দেওয়া যাবে না। তবে কোটি কোটি গ্রাহক, লাখ লাখ এজেন্ট-মার্চেন্ট এবং বিপুল রেমিট্যান্স প্রবাহের সঙ্গে যখন একটি ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হয়ে যায়, তখন প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, তথ্য নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক নজরদারি—চারটিই আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ তাই শুধু বিকাশ কত বড় হলো, সেই প্রশ্নে নয়; বরং গ্রাহকের জন্য কতগুলো শক্তিশালী, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প তৈরি হলো—সেটিই হবে বড় ধরনের মাপকাঠি।

আরো