পূবালী ব্যাংকেও গলদ

ভিক্ষুকের একাউন্টে ৯০ লাখ টাকা লেনদেন, জানেন না ভিক্ষুক

পূবালী ব্যাংকের এই একাউন্টগুলো করার সময় অবশ্যই কর্মকর্তাদের মাধ্যমে করিয়েছেন অপরাধীরা। এর দায় ওই শাখার তৎকালীন ম্যানেজারসহ কর্মকর্তাদের।

বলছিলাম কুড়িগ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আশির‌ও বেশি বয়স বিধবা নবিরন বেগম। ভিটেমাটি নেই, নিজের নামে বরাদ্দ নেই কোনো ঘরও। অন্যের ঘরে থেকে গ্রামে ভিক্ষা করে চলে তার সংসার। অথচ তার নামে পূবালী ব্যাংকের কুড়িগ্রামের ঘোষপাড়া শাখায় খোলা হয়েছে একটি ব্যাংক হিসাব। সেই হিসাবে লেনদেন হয়েছে প্রায় ৯০ লাখ টাকা। তবে এ বিষয়ে কিছুই জানেন না নবিরন।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধু নবিরন নন, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের ধরলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের আরও কয়েকজন বাসিন্দার নামেও ব্যাংক হিসাব খোলার তথ্য পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীরা জানায়, তারা কোনোদিন ব্যাংকেই যায়নি। এমন কী তাদের অনেকে পূবালী ব্যাংক নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ করতে পারেন না। এবং পূবালী ব্যাংকের শাখা কোথায় সেটাও জানেন না।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, এক থেকে দেড় বছর আগে ধরলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে বিধবা ভাতা, সরকারি ঘর দেওয়ার কথা বলে একদল তরুণ ভুক্তভোগীদের জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি, আঙুলের ছাপ প্রভৃতি নেয়। এরপর তাদের আর দেখা যায়নি।
শুধু তাই নয়, অভিনব এই প্রতারক চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন আদালতে একটি মামলাও হয়েছে। মামলা চালাতে গিয়ে ভিটেমাটিহীন এসব মানুষ হচ্ছে নিঃস্ব। তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা এই ঘটনায় হওয়া মামলা সম্পর্কে জানে। কিন্তু কীভাবে ঐ শাখায় ব্যাংক হিসাব খোলা হলো তারা সে বিষয়ে অবগত নন।

সাংবাদিকদের হাতে আসা ব্যাংক হিসাবের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ভিক্ষুক নবিরন বেগমের নামে খোলা ওই হিসাবে মোট ৯০ লাখ ২৪ হাজার ২৮২ টাকা লেনদেন হয়েছে। অনলাইন ট্রানজেকশনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এসব লেনদেন। আর বেশির ভাগ অর্থ এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়।
নবিরনের দাবি, তিনি কখনো পূবালী ব্যাংকে যায়নি। বছর দেড়েক আগে ধরলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে কয়েকজন তরুণ এসে বিধবা ভাতা, ও সরকারি ঘর দেওয়ার কথা বলে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি ও আঙুলের ছাপ নেয়। এরপর তারা আর কখনো আসেনি।
নবিরন আরো বলেন, ভাতা, গরু-ছাগল দেওয়ার কথা বলে এনআইডি, ছবি তুলে নিয়ে যায় চক্রের সদস্যরা। এরপর তিনি আর কিছুই জানেন না। এখন নিজের নামে মামলা হয়েছে জানতে পেরে পুলিশের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

ভিক্ষুক নমিরন এর মতো একই অবস্থা আশ্রয়ণ প্রকল্পের আহিনা বিবির। তার নামেও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে প্রায় ২৩ লাখ টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে চক্রটি।
আহিনা বিবি বলেন, কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম থেকে ২৩ লাখ টাকার আত্মসাতের একটি নোটিশ আসে। অথচ তিনি কখনো পূবালী ব্যাংকে যাননি এবং ওই টাকা কারা লেনদেন করেছে, তাও জানেন না তিনি।
এর আগে, একই আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দা বৃদ্ধ আনছার আলীও প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের মামলায় ৮ দিন জেল খাটেন। পরে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হলে, পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ টাকা পরিশোধ করে বৃদ্ধার বিরুদ্ধে মামলাটি সমাধান করে দেয়। এবার তার স্ত্রী ফরিদা বেগমের নামে একই শাখায় ব্যাংক হিসাব খোলার তথ্য পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে ফরিদা বেগম জানালেন, ‘কে জানে কখন কোন মামলায় ফাইস্যা যাই। একবার তো (হয়রানি) হইলাম। আমার স্বামী জেল খাটিল। আর আমরা আর হয়রানি হতে চাই না। আমরা এগুলো থেকি মুক্তি চাই।

বাসায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন শেফালী বেগম। তার নামেও একই শাখায় ব্যাংক হিসাব খুলে লেনদেন করা হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। তবে এ বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনিও।
তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আমি ব্যাংকে গিয়েছিলাম, কেউ আমাদের কথা শোনে না। বরং ব্যাংকের লোকেই বলে, আপনার তো কম টাকা। আপনি কিছু দেন, সমাধান হবে। আমরা এখন কোথায় যাবো।

স্থানীয়দের দাবি, ধরলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের অনেকের নামেই ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করছে সিন্ডিকেট চক্র। এতে না জেনেই মামলার আসামি হয়ে পড়ছেন দরিদ্র ও ভিটেমাটিহীন মানুষগুলো এবং আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তারা। তাই সঠিক তদন্তের মাধ্যমে চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি স্থানীয়দের।

পূবালী ব্যাংক কুড়িগ্রাম শাখার ম্যানেজার এ এইচ এম আলমগীর কবিরের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। ওই শাখার এক কর্মকর্তা জানান, এ ঘটনায় আদালতে দুইটি মামলা হয়েছে এবং তা সিআইডি তদন্ত করছে।

আরো