রুমির ‘মসনভি’: পাশ্চাত্যের সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ
মসনবী বা মসনবী-ই মা’নবী (ফার্সি: مثنوی معنوی) হল জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি রচিত একটি বিখ্যাত ফার্সি সুফী কবিতা। সুফিবাদের উপর রচিত এটি সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী রচনার মধ্যে একটি। মসনবী ছয়টি কবিতার বইয়ের সংকলন। এই আধ্যাত্মিক ধাঁচের লেখনীটি কীভাবে স্রষ্টার সাথে প্রেমের লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় তার শিক্ষা দেয়। এতে কুরআন ও আধ্যাত্মিক জীবন সম্পর্কিত রুমির গভীর উপলব্ধির বর্ণনা রয়েছে। মসনবীকে প্রায়ই ‘ফার্সি কুরআন’ বলে অভিহিত করা হয়। তবে আধ্যাত্মিকতাই এই গ্রন্থের সারবস্তু!
মসনবী-ই মা’নবী (ফার্সি: مثنوی معنوی) শিরোনামটির অর্থ হল ‘আধ্যাত্মিক শ্লোক- কোরআন, হাদিস ও প্রাত্যহিক ঘটনা থেকে নেওয়া সংক্ষিপ্ত কাহিনী বা গল্প। গল্পগুলো একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে বর্ণনা করা হয়েছে এবং সবগুলো নীতিকথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন রকমের ইসলামি জ্ঞানের সমাহার রয়েছে, কিন্তু প্রাথমিক দৃষ্টিকোণ থেকে এতে ব্যক্তিগত সুফিবাদকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রুমির ‘দিওয়ান’ বইয়ের সাথে তুলনা করলে এটি তুলনামূলকভাবে পরিমিত মাত্রা মেনে চলে। এতে আধ্যাত্মিক জীবনের বিভিন্ন দিক এবং সুফিবাদের শিষ্যত্ব গ্রহণকারী বা যারা জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাদের অনুশীলন সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে।
ইরানীরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন, মসনভি’ পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যা। পারস্যের বিখ্যাত কবি আবদুর রহমান জামি বলেছেন, ‘মসনভিয়ে মানাভিয়ে মাওলাভি/ হাস্ত কোরআন দার যাবানে পাহলাভি।’ অর্থাৎ মৌলভি রুমির আধ্যাত্মিক মসনভি যেন ফারসি ভাষায় লিখিত কোরআনের প্রতিফলন।
মসনভির প্রথম গল্পটি দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক। গল্পটি একজন বাদশাহ ও একজন দাসীর। গল্পটি এ রকম: এক বাদশাহ শিকারের জন্য একদিন জঙ্গলে গিয়ে অপরূপ সুন্দরী এক দাসীকে দেখতে পেলেন। দেখামাত্র বাদশাহ তার প্রেমে পড়ে গেলেন। জঙ্গল থেকে দাসীকে ধরে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু রাজপ্রাসাদে এসে সেই দাসী অসুস্থ্য হয়ে নাওয়া–খাওয়া সব ছেড়ে দেয়। বাদশাহ দাসীর অসুস্থতায় চিন্তিত হয়ে পড়েন। দাসীকে সুস্থ করার জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হেকিম এনে দেখাতে থাকেন। কিন্তু কেউ দাসীকে সুস্থ্য করতে পারে না। বাদশাহ নিরাশ হয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। রাতে বাদশাহ স্বপ্নে দেখলেন, পরদিন সকালে রাজদরবারের দরজায় একজন বৃদ্ধ বিজ্ঞ হেকিম আসবেন। তিনিই এই দাসীকে সুস্থ করতে পারবেন। পরদিন সকাল হতেই একজন বৃদ্ধ হেকিম রাজদরবারে এলেন।
বাদশাহ হেকিমকে দাসীর অবস্থা সব বুঝিয়ে বললেন। হেকিম বললেন, আমিই এই অসুখের চিকিৎসা করতে পারব। হেকিম দাসীর সঙ্গে একান্তে কথা বলার অনুমতি চাইলেন। দাসীর সঙ্গে কথা বলে হেকিম জানতে পারলেন, জঙ্গলে থাকা অবস্থায় একজন স্বর্ণকার ছেলের সঙ্গে দাসীর প্রেম ছিল। সেই স্বর্ণকারের বিরহেই সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হেকিম বাদশাহকে দাসীর বৃত্তান্ত সব জানালেন এবং ওই স্বর্ণকার ছেলেকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করলেন। হেকিমের অনুরোধে বাদশাহ সেই স্বর্ণকারকে অনেক টাকা পারিশ্রমিক দিয়ে রাজদরবারে নিয়ে এলেন। স্বর্ণকারকে রাজদরবারে দেখামাত্র দাসী সুস্থ হয়ে গেল। আগের মতো আনন্দে রাজদরবারে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এবার হেকিম স্বর্ণকার ছেলের খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দিতে শুরু করলেন। বিষের প্রভাবে স্বর্ণকারের চেহারা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। স্বর্ণকার ছেলের চেহারা যতই নষ্ট হতে লাগল, দাসীর অন্তরে স্বর্ণকারের প্রতি প্রেমও তত কমে যেতে লাগল। আস্তে আস্তে দাসী বাদশাহর প্রেমের প্রতি আকৃষ্ট হলো। এভাবেই দাসী একদিন স্বর্ণকারকে ভুলে গিয়ে বাদশাহর মন জয় করে নিল।
গল্পটি শুনতে নিছক একটি প্রেমের রূপকথা মনে হলেও এই গল্পে পবিত্র কোরআনের দুটি আয়াতের প্রতিফলন দেখা যাবে। ঘটনাটি পবিত্র কোরআনের সুরা হাদিদের ২০ নম্বর ও সুরা কাহাফের ১৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা জেনে রাখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, আত্মপ্রশংসা ও ধনে-জনে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর উপমা (সেই) বৃষ্টি, যা উৎপন্ন শস্যসম্ভার দিয়ে অবিশ্বাসীদের চমৎকৃত করে। তারপর তা শুকিয়ে যায়, আর তাই তুমি তাকে হলুদ বর্ণ দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়কুটোয় পরিণত হয়। পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২০)
আল্লামা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি (ফার্সি: جلالالدین محمد رومی; (৩০ সেপ্টেম্বর, ১২০৭-১৭ ডিসেম্বর, ১২৭৩), যিনি জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ বালখী, মাওলানা রুমি, মৌলভি রুমি নামে তবে শুধু মাত্র রুমি নামেও পরিচিত, ১৩শ শতাব্দীর একজন ফার্সি সুন্নি মুসলিম কবি, আইনজ্ঞ, ইসলামি ব্যক্তিত্ব, ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রিয়বাদী এবং সুফী ছিলেন। রুমির প্রভাব দেশের সীমানা এবং জাতিগত পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে পড়েছে; ফার্সি, তাজাকিস্তানি, তুর্কি, গ্রিক, পশতুন, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানরা বিগত সাত শতক ধরে বেশ ভালভাবেই তার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে যথাযথভাবে সমাদৃত করে আসছে। তার কবিতা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বিভিন্ন ধারায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। রুমিকে যুক্তরাষ্ট্রের “সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি” এবং “সর্বাধিক বিক্রীত কবি” হিসেবে উল্লেখ করা হয়।