মুসলিম জাতিসত্ত্বার ধারক ও রেনেসাঁর প্রিয় কবি আল্লামা ইকবাল

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

প্রিয় কবি আল্লামা ইকবাল ১৮৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন।
তার আবির্ভাব ছিল উপমহাদেশের ঘোরতর দুঃসময়ে ত্রাণকর্তার মতো। তার স্বতন্ত্র, দুঃসাহসী উচ্চারণ চুরমার করতে চেয়েছে পরাধীন মানুষের হীনম্মন্যতার দেয়াল। তাদের চেতনার ঠাণ্ডা আকাশ মুখর করে তুলেছে তার চিন্তার জ্যোতিষ্কের কোলাহল। ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম চেতনাসীমায় ইকবালের কবিতা ছিল স্বপ্নের পুনরুত্থানের মতো। তার চিন্তাধারা ছিল স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসা নবজন্মের ইশতেহার। ক্ষুদ্রতার, সঙ্কীর্ণতার, সংস্কারের সব প্রাচীরের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল তাঁর কবিতা। ‘তারানা-ই-হিন্দি’ ও ‘তারানায়ে মিল্লি’ তাঁর অমর সৃষ্টি। তারানায়ে হিন্দিতে তিনি ভারতবর্ষের মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। سارے جہاں سے اچھا কবিতাটি ১৬ আগস্ট, ১৯০৪ খ্রী: সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি লিখলেন-
সারে জাঁহা সে আচ্ছা, হিন্দুস্তাঁ হমারা,
হম বুলবুলেঁ হৈ ইস্কী, ইয়ে গুলসিস্তা হামারা।
— সারে জাঁহা সে আচ্ছা…
১৯০৫ খ্রি: বঙ্গভঙ্গের বছর লাহোরের গভর্ণমেন্ট কলেজের একটি অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বের ভাষণের পরিবর্তে তিনি এই কবিতা আবৃতি করে শোনান।
১৯২৪ খ্রি. بان٘گِ دَرا‎‎ নামক গ্রন্থে তরাণা-এ-হিন্দী নামে এই কবিতাটি প্রকাশিত হয়।

*তারানা-ই-মিল্লি* উর্দু : ترانۂ ملی মূলতঃ একটি উদ্দীপনামূলক কবিতা যেখানে আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল মুসলিম উম্মাহর একক জাতিসত্ত্বার দিকে আহবান জানিয়েছেন এবং ইসলামকে সমগ্র বিশ্বের ধর্ম হিসাবে উপস্থাপন করেছেন।

আল্লামা ইকবালের ‘ওয়াতানিয়াত’ (জাতীয়তাবাদ) কবিতাটি তাঁর বিখ্যাত উর্দু কাব্যগ্রন্থ ‘বাং-ই-দারা’ (Bang-e-Dra)-এর অন্তর্ভুক্ত। এই কবিতায় তিনি আধুনিক ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের ধারণাকে ধর্মের বিরোধী এবং এক প্রকার ‘মূর্তিপূজা’ হিসেবে কঠোর সমালোচনা করেছেন। ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের ধারণাকে সমালোচনা করে তা ‘নব্য খোদা’ বা ধ্বংসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্বের সকল মুসলমানকে একটি একক জাতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মুসলিম উম্মাহকে জাতীয়তাবাদী বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের উদাত্ত আহবান জানান। বিশেষজ্ঞরা একে ইকবালের দৃষ্টিভঙ্গির বদল হিসাবে আখ্যা দিয়েছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টির স্বপ্নদ্রষ্টা আল্লামা ইকবাল লিখেন-
”চীন ও আরব হামারা, হিন্দুসতা হামারা, মুসলিম হ্যায় হাম ওয়াতান হ্যায় সারা জাহা হামারা”
অর্থাৎ
‘চীন আমার, আরব আমার, ভারতও আমার নয়কো পর
জগৎ জোড়া মুসলিম আমি, সারাটি জাহান বেঁধেছি ঘর।’
মহাকবি ইকবালের এই বক্তব্য মহানবী সাঃ এর মহান বাণীর অনুরণন। মহানবী সাঃ বলেন-“মুমিনরা পারস্পরিক দয়া, সহানুভূতি ও সমবেদনার ক্ষেত্রে একটি দেহের মতো। যখন এর কোনো একটি অঙ্গ কষ্ট পায়, তখন পুরো দেহ সজাগ হয়ে ওঠে এবং জ্বরে আক্রান্ত হয়।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।

বোধোদয়ের প্রেক্ষাপট
ইকবাল শুরুতে ভারতবর্ষকে নিয় ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’র মতো দেশপ্রেমমূলক কবিতা লিখলেও, ১৯০৮ সালে ইউরোপ থেকে ফিরে আসার পর তাঁর দর্শনে পরিবর্তন আসে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ মুসলিম উম্মাহর ঐক্যকে খণ্ডিত করছে। এই প্রেক্ষাপটেই তিনি ‘ওয়াতানিয়াত’ কবিতাটি রচনা করেন, যেখানে তিনি ভৌগোলিক দেশপ্রেমের রাজনৈতিক সংজ্ঞাকে ইসলামের আধ্যাত্মিক দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখিয়েছেন।

ওয়াতানিয়াত’ (জাতীয়তাবাদ) কবিতাটি তাঁর বিখ্যাত উর্দু কাব্যগ্রন্থ ‘বাং-ই-দারা’ (Bang-e-Dra)-এর অন্তর্ভুক্ত। এই কবিতায় তিনি আধুনিক ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের ধারণাকে ধর্মের বিরোধী এবং এক প্রকার ‘মূর্তিপূজা’ হিসেবে কঠোর সমালোচনা করেছেন।

কবিতার মূল বক্তব্য
*নব্য খোদা: ইকবাল এই কবিতায় দেশ বা জাতীয়তাবাদকে একটি আধুনিক ‘বুত’ বা মূর্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, আধুনিক সভ্যতার পূজারিরা যে সব নতুন খোদা তৈরি করেছে, তার মধ্যে ‘দেশ’ (Watan) হলো সবচেয়ে বড়।

*ধর্মের কাফন: তিনি লিখেছেন, এই জাতীয়তাবাদের পোশাক আসলে ধর্মের কাফন স্বরূপ (“জো পাইরাহান ইসকা হ্যাঁয়, ওহ মাযহাব কা কাফান হ্যাঁয়”), যা দ্বীনের মূলে আঘাত করে।
*সীমানাহীনতা: তিনি মুসলিমদের কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ না থেকে ইসলামের বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সমুদ্রের মাছের মতো রাষ্ট্রবিহীন মুক্ত বসবাসই মুসলিমদের প্রকৃত পরিচয় হওয়া উচিত।

আল্লামা ইকবাল উপমহাদেশের মুক্তিকামী মানুষের আত্মজাগরণের পথিকৃৎ এক মহান কবি দার্শনিক ও শিল্পী-প্রতিভা। তার সৃষ্টি, শিক্ষা, দৃষ্টি ও আদর্শের মধ্যে আমাদের জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের স্বভাব ও স্বরূপ অসামান্য উজ্জ্বলতায় উৎকীর্ণ। ফলে ইকবাল সত্তায় কেবল এক কবির বসবাস নয়, বরং রয়েছে এক মহান আদর্শের উত্তরাধিকার।

আল্লামা ইকবাল উপমহাদেশের মুক্তিকামী মানুষের আত্মজাগরণের পথিকৃৎ এক মহান কবি দার্শনিক ও শিল্পী-প্রতিভা। তার সৃষ্টি, শিক্ষা, দৃষ্টি ও আদর্শের মধ্যে আমাদের জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের স্বভাব ও স্বরূপ অসামান্য উজ্জ্বলতায় উৎকীর্ণ।

আরো