হেদায়াত: মানুষের অন্তরের সাথে কোরআনের আলোর সংযোগ
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
প্রাঞ্জল ভাষা, বক্তব্যের সহজবোধ্যতা, সুষ্পষ্টতা ও তাৎপর্য্যতা, অনিন্দ্য সুন্দর উপমা, বাক্য গঠন ইত্যাদি কোরআনের সবকিছুতেই অসাধারণ সৌন্দর্য্য দেখতে পাই। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ওহীর বাণী, যা মানুষের জন্য জীবন বিধান এবং সঠিক পথের নির্দেশিকা। এটিতে মহান স্রষ্টার একত্ব, নৈতিকতা, আইন, প্রার্থনা, এবং পূর্ববর্তী নবীদের ঐতিহাসিক বর্ণনাসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কোরআনের প্রধান বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর পরিচয়, তাঁর ক্ষমতা, ও গুণাবলী, এবং মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও করুণা। আমরা অনেকে শুধুমাত্র পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের হক্ব আদায় করি অথচ বিজ্ঞানময় কোরআনের চিন্তা ও গবেষণায় আমাদের অনেকের কোন দৈনন্দিন পরিকল্পণা নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন-‘তারা কি কোরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না, নাকি তাদের হৃদয়ে তালা লাগানো আছে? (সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২৪)
কোরআনের মূল বিষয়বস্তু নিম্নরূপ:
আল্লাহর একত্ববাদের গুণাবলী: আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো অংশীদার নেই এবং তিনি সকল ক্ষমতার অধিকারী। কোরআনে আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলী যেমন – পরম দয়াময় (আর-রাহমান), পরম করুণাময় (আর-রাহীম), এবং সর্বজ্ঞ (সব বিষয়ে জ্ঞাত) সম্পর্কে বলা হয়েছে।
কোরআনের নৈতিক ও আইনি দিক: কোরআনে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনকানুন সম্পর্কে নির্দেশনা রয়েছে।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলী: বিভিন্ন জাতির উত্থান পতন ও ধ্বংসের ঘটনা, পূর্ববর্তী নবী ও আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণের সংগ্রামী জীবন ও ঐতিহাসিক ঘটনা বিধৃত হয়েছে।
প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিকতা: কোরআনে প্রার্থনা, দান, এবং আধ্যাত্মিকতার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
পুনরুত্থান ও পরকাল: পরকালের জীবন, হিসাব-নিকাশ এবং প্রতিদান সম্পর্কে বলা হয়েছে।
কোরআনের আবেদন ও প্রেরণা: কোরআনের অনুপ্রেরণামূলক আয়াতগুলো বিশ্বাসীদের মধ্যে আশা জাগিয়ে তোলে এবং হতাশা দূর করে।
জীবনের পথপ্রদর্শক: কোরআনকে জীবনের একটি সঠিক পথনির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা: আধুনিক প্রশ্ন ও সমস্যা সমাধানের জন্য কোরআনের আয়াত এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তির উপর আলোচনা করা হয়।
মহাগ্রন্থ আল ক্বোরআন মূলতঃ মানব অন্তরকে আলোকিত করার সূযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। সেই আলো কেউ গ্রহণ করতে উদ্যোগী হলে মহান আল্লাহ্ তাকে হেদায়াতের মত মূল্যবান সৌন্দর্য্য দান করেন। অন্তরের সজীবতা মৃত ও জীবিত অন্তরের নির্ণায়ক। সুরা আন’আমের ১২২ আয়াতে বলা হয়েছে যে- “যারা মৃত (অবিশ্বাস ও কুফরের কারণে) এবং যাকে আল্লাহ আলো (ঈমান) দ্বারা জীবিত করেছেন, তাদের উভয়ের অবস্থা একই রকম নয়। যে জীবিত এবং যার অন্তর ঈমান দ্বারা আলোকিত, সে মানুষের মাঝে আলো নিয়ে চলে, কিন্তু যে মৃত এবং কুফরের অন্ধকারে নিমজ্জিত, সে অন্ধকার থেকে বের হতে পারে না।” উক্ত আয়াতের সাথে মিলিয়ে কবি আহমদ শাওকি মহানবী সাঃকে উদ্দেশ্য করে তাঁর কবিতায় লিখেছেন: নবীগণ আয়াত নিয়ে এসেছিলেন, যা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু তুমি এমন কিতাব এনেছ, যা কখনো শেষ হয় না। তাঁর আয়াতগুলো সময়ের সঙ্গে নতুন হয়, পুরোনো হলেও মহিমায় ভরা। ঈসা আঃ মৃতকে জীবিত করেছিলেন, কিন্তু তুমি অস্তিত্বহীন প্রজন্মকে জীবন দিয়েছ।
পবিত্র কোরআন মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করার জন্য নাজিল হয়েছে, কিন্তু অনেক সময় আমরা এর মহিমান্বিত গভীরতায় ডুব দিই না। আল্লাহ তাআলা সুরা মুহাম্মাদের ২৪নং আয়াত: বলেন-‘তারা কি কোরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করেনা, নাকি তাদের হৃদয়ে তালা লাগানো আছে? কোরআনের আলৌকিকতা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-যদি কোন কোরআন এমন হত, যার সাহায্যে পাহাড় চলমান হয় অথবা যমীন খন্ডিত হয় অথবা মৃতরা কথা বলে, তবে কি হত? বরং সব কাজ তো আল্লাহর হাতে। ঈমানদাররা কি এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয় যে, যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে সব মানুষকে সৎপথে পরিচালিত করতেন? কাফেররা তাদের কৃতকর্মের কারণে সব সময় আঘাত পেতে থাকবে অথবা তাদের গৃহের নিকটবর্তী স্থানে আঘাত নেমে আসবে, যে, পর্যন্ত আল্লাহর ওয়াদা না আসে। নিশ্চয় আল্লাহ ওয়াদার খেলাফ করেন না। (সুরা রাদ, আয়াত: ৩১)
মানুষের হৃদয় বড় কঠিন! সুন্দর উপমায় সহজে গ্রহণ ও অনুসরণ করতে মন চায়না। পাথরের বাইরে নরম লাগলেও ভেতরে কঠিন, কিন্তু আমাদের হৃদয় তার চেয়েও শক্ত। যাঁরা কোরআনের স্পর্শ অনুভব করেছেন, তাঁরা এর সত্যতা খুব সহজেই হৃদয়ে টের পান। সাইয়্যিদ কুতুব (রহ.) ‘ফি যিলালিল কোরআন’ তাফসিরে বলেছেন-এই আয়াতের আলোই একমাত্র এই অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। (ফি যিলালিল কোরআন, ৪/২১৫৬) মহান আল্লাহ যেমন বলেন- ‘অতঃপর তোমাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে, তা পাথরের মতো বা তার চেয়েও কঠিন। পাথর থেকে তো নদী বের হয়, ফেটে পানি বের হয়, কিছু পাথর আল্লাহর ভয়ে নিচে খসে পড়ে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৭৪)
মক্কার মুশরিকরা মহানবী সা:কে একসময় চ্যালেঞ্জ করে বলেছিল- পাহাড় সরাও, বাতাসকে আমাদের বাহন বানাও, মৃতদের জীবিত করো—যেমন দাউদ (আ:)-এর জন্য পাহাড় সঞ্চালিত হতো, সুলাইমান (আ.)-এর জন্য বাতাস নিয়ন্ত্রিত হতো, ইসা (আ.) মৃতদের জীবিত করতেন। তাদের দাবীর বিষয়ে সুরা আনআমের ১২৪নং আয়াতে কারীমায় আল্লাহ্ বলেন- “আমরা বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আমাদেরকে দেওয়া হয় (পূর্ববর্তী) রাসুলদের মতো কিছু।” জবাবে আল্লাহ সূরা হাশরের ২১ নং আয়াত নাজিলের মাধ্যমে বোঝানো হয় কোরআনের মহত্ত্ব এসবের চেয়ে অনেক বড়। মহান আল্লাহ্ বলেন- “আমি যদি এ কুরআনকে পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে তুমি আল্লাহর ভয়ে তাকে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। এ সব উদাহরণ আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি যাতে তারা (নিজেদের ব্যাপারে) চিন্তা-ভাবনা করে।
মুশরিকদের দাবী অনুযায়ী এসব মোজেজা দেখানো হতো—পাহাড় সরানো, পৃথিবী খণ্ডিত করা, মৃতদের কথা বলানো—তবু তারা ইমান আনত না। মুফাসসিরগণের মতে- এটি সেই লোকদের জন্য, যারা জেদ করে। আল্লাহ বলেন- ‘যদি আমি ফেরেশতা নাজিল করতাম, মৃতরা কথা বলত, সবকিছু তাদের সামনে জড়ো করতাম, তবু তারা ইমান আনতনা। মুফাসসিরগণের মতে- এটি সেই লোকদের জন্য, যারা জেদ করে। আল্লাহ বলেন- ‘যদি আমি ফেরেশতা নাজিল করতাম, মৃতরা কথা বলত, সবকিছু তাদের সামনে জড়ো করতাম, তবু তারা ইমান আনত না; যদি না আল্লাহ চান।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১১১)অন্য আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে: ‘যাদের ওপর তোমার রবের কথা সত্য হয়েছে, তারা ইমান আনবে না যদিও সব নিদর্শন আসে, যতক্ষণ না কঠিন শাস্তি দেখে তারা।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৯৬-৯৭)
নবীজি (সা.) মক্কার মুশরিকদের ঈমানের জন্য বেশ উদগ্রীব ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এভাবে- তোমার কাজ শুধু পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীবকে বললেন-‘তুমি হয়তো নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে তাদের পেছনে, যদি তারা এই কথায় ঈমান না আনে।’(সুরা কাহফ, আয়াত: ৬)
মূলতঃ হেদায়াত মানুষের অন্তরের সাথে কোরআনের আলোর সংযোগ, কেউ আগ্রহী হলে কোরআনই হেদায়েতের পথ দেখাবে, নিঃসন্দেহে।