আধুনিক ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম প্রধান রূপকার, ড. উমর চাপরা আর নেই (১৯৩৩-২০২৬)
আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন
২৩ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি (১৩ জুন, ২০২৬)। পবিত্র মক্কা নগরীর আকাশ তখন গোধূলির আলোয় মলিন। চারদিকে এক স্তব্ধতা নেমে এলো, যখন খবর ছড়ালো-আধুনিক ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম প্রধান রূপকার, ড. উমর চাপরা আর নেই।
তিনি জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময় কাটিয়েছেন সুদভিত্তিক ও বৈষম্যমূলক অর্থব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে একটি ‘ন্যায়ভিত্তিক সমাজ’ (Just Society) গড়ার তাত্ত্বিক লড়াইয়ে, তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি রচিত হলো ইসলামের সবচেয়ে পবিত্রতম স্থানে।
পরদিন, অর্থাৎ ১৪ জুন ফজরের নামাজ শেষে যখন কাবা শরিফের চত্বরে লক্ষাধিক মুসল্লির উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয় ঐতিহাসিক ‘জান্নাতুল মুয়াল্লা’ কবরস্থানে- যেখানে ঘুমিয়ে আছেন উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.)সহ ইসলামের বহু প্রথম সারির সারথি।
এই বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদের শুরুর পথটা ছিল চরম দারিদ্র্যে ঘেরা। ১৯৩৩ সালে অবিভক্ত ভারতের মুম্বাইয়ে এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন তিনি। তাঁর বয়স যখন মাত্র ছয় বছর, তখন তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। ১৯৩০-এর দশকের বিশ্বজুড়ে সেই চরম অর্থনৈতিক মন্দার যুগে এক বিধবা মায়ের পক্ষে চার সন্তান নিয়ে টিকে থাকাটাই ছিল এক অলৌকিক ব্যাপার।
পরিবারের চরম দূরবস্থা দেখে আত্মীয়-স্বজনরা পরামর্শ দিয়েছিলেন, লেখাপড়া বাদ দিয়ে উমরকে যেন কাপড়ের দোকানে থান খোলার (কাপড়ের গাঁট খোলার) কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। অন্তত দুটো পয়সা আসবে, সংসার চলবে।
কিন্তু ধন্য তাঁর মা! যিনি দারিদ্র্যের কাছে মাথা নত করেননি। তাঁর মা সেদিন এক ব্যতিক্রমী ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি সেদিন দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, “আমার সন্তান কাপড়ের গাঁট খুলবে না, সে বইয়ের পাতা খুলবে।”
মায়ের সেই সিদ্ধান্ত ও আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। মায়ের সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর জেদ বুকে নিয়ে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেন উমর চাপরা। পরবর্তীতে আমেরিকার মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
যে ছেলেকে কাপড়ের দোকানের কর্মচারী বানানোর কথা ভাবা হয়েছিল, তিনিই একদিন হার্ভার্ড ল স্কুল, অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের মতো বিশ্বসেরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে অর্থনীতির ওপর বক্তৃতা দেন, বিশ্বকে অর্থনীতি শেখাতে শুরু করেন।
আমেরিকার উইসকনসিন ও কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সময় ড. চাপরা বিলাসবহুল জীবন ও পশ্চিমা অর্থব্যবস্থার খুব কাছাকাছি ছিলেন। কিন্তু তাঁর অন্তরে সবসময়ব্যাকুলতা কাজ করত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতরের চরম শূন্যতা, ধনী-দরিদ্রের আকাশচুম্বী বৈষম্য এবং সুদের মরণকামড় তাঁকে প্রতিনিয়ত পীড়িত করত।
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মানবজাতিকে যদি অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে হয়, তবে ইসলামের ‘মাকাসিদ আশ-শরিয়াহ’ (শরিয়াহর মূল উদ্দেশ্যসমূহ) ভিত্তিক
কল্যাণমুখী মডেলের বাস্তব প্রয়োগ প্রয়োজন।
এই গভীর তাগিদ থেকেই তিনি ১৯৬৫ সালে আমেরিকার নিশ্চিত ও আরামদায়ক ক্যারিয়ার ছেড়ে সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় ব্যাংক- সৌদি আরাবিয়ান মনিটারি এজেন্সি এর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। অনেকেই তখন তাঁর এই সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছিল। কিন্তু ড. চাপরা বলতেন, তিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য প্র্যাক্টিক্যাল কিছু করে যেতে চান।
টানা ৩৫ বছর তিনি সৌদি আরবের মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে মূল কারিগরের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬০-এর দশকে সৌদি আরবের চরম মূল্যস্ফীতির সময় তাঁর নেওয়া দূরদর্শী নীতি দেশটির অর্থনীতিকে বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়েছিল। তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সৌদি সরকার তাঁকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে।
তিনি দীর্ঘ কর্মজীবনে মোট ১৫টির মতো বই ও মনোগ্রাফ (Monograph) লিখেছেন। এর বাইরেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল ও সেমিনারে তাঁর ৯০+ গবেষণাপত্র এবং বইয়ের রিভিউ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর এই বইগুলো ইংরেজি, আরবি, উর্দু, ফারসি, তুর্কি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, স্প্যানিশ এবং বাংলাসহ পৃথিবীর বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং সারাবিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তাঁর বইয়ের প্রতিটি লাইনে মিশে থাকত সাধারণ মানুষের জন্য এক গভীর আর্তি। তিনি বলতেন, অর্থনীতি মানে কেবল জিডিপি (GDP) আর সংখ্যার খেলা নয়; অর্থনীতি হলো মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং আত্মিক প্রশান্তির নাম। পশ্চিমা গবেষক ডারহাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রডনি উইলসন তাঁর বইয়ের রিভিউতে লিখেছিলেন, “ইসলামী মুদ্রা তত্ত্বের ওপর এটি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা।”
অর্থনীতিতে অনন্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৯ সালে ‘ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক পুরস্কার’ এবং ১৯৯০ সালে মুসলিম বিশ্বের নোবেল খ্যাত অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার’ লাভ করেন।