এনবিআরের শহিদুল ইসলামের কান্ডে তার এলাকা বাগেরহাটের মানুষও হতবাক
বিদেশে টাকা পাচারসহ হাজার কোটি টাকার মালিক শহিদুল দম্পতি
স্টফ রিপোর্টার: শহিদুল ইসলামের কান্ডে তার এলাকা বাগেরহাটের মানুষও হতবাক, এলাকায় করেনি কোন সম্পদ। শুধুই বাবার নামে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে মোশারফ হোসেন ডিগ্রি কলেজ করেন, এলাকার মানুষের চোখে পড়বে সে কারণেই সম্পদ করেনি এলাকায়।
অথচ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছড়ানো ছিটানো সম্পদের পাহাড়, কানাডা অস্ট্রেলিয়া দুবাইসহ বহু জায়গায় তার বাড়ি ফ্ল্যাট, রয়েছে স্বর্ণের ব্যবসা, এবং জানা-অজানা রয়েছে প্রচুর সম্পদ। শহিদুল ইসলামের দুই ভাই, একজনের নাম সেলিম চট্টগ্রামে সিএনডেফ এর দুটি লাইসেন্স করে শহিদুল চেয়ারে থাকা অবস্থায় বিজনেসের সাথে জড়িত, ছোট ভাই জাকির তার নামে রয়েছে প্রচুর সম্পদ, শহিদুলের তিন ছেলে দুই ছেলে জমজ লেখাপড়া করেছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডাতে সেটেল কানাডাতে রয়েছে দুইটি বাড়ি ভাড়া দিয়ে তারা থাকে ভাড়া বাসায়। মানুষের চোখ এড়ানোর জন্যই এই কাজ। অস্ট্রেলিয়াতে রয়েছে তাদের বাড়ি এবং দুবাইতে রয়েছে বড় ধরনের স্বর্ণের ব্যবসা। কিছুদিন আগে শহিদুল দেশ ত্যাগ করেন অসুস্থতার বাহানায় বউ এবং ছোট ছেলেসহ মালয়েশিয়ার চলে যায়। একটি বিশ্বস্ত সূত্র থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায় তিনি আর দেশে ফিরবেন না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চাকরি করে ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাটসহ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ গড়েছেন তিনি। রয়েছে একাধিক আলিশান বাড়ি, অন্তত ২০টি প্লট ও দোকানপাট। সহিদুল ইসলাম নামের এনবিআরের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা শহিদুল।
শহিদুলের শুধু ফ্ল্যাটের দামই আছে ১৬২ কোটি টাকা, প্লট, ফ্ল্যাট, দোকান ও শেয়ারবাজার কানাডা অস্ট্রেলিয়া দুবাইতে বিনিয়োগ যোগ করলে মোট সম্পদের পরিমাণ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরার জি ব্লকে ১০তলা একটি ভবন নির্মাণ করেছে সহিদুল দম্পতি। ভবনের নাম ‘শেল কবিতা’। বর্তমানে সেখানেই বসবাস করছেন তারা। প্রতি ফ্লোরে আড়াই হাজার বর্গফুটের দুটি করে ফ্ল্যাট। ২০ ফ্ল্যাটের পুরো ভবনটিই তাদের।
একাধিক ফ্ল্যাট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম অন্তত পাঁচ কোটি টাকা। সেই হিসাবে শুধু ফ্ল্যাটের দামই কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা। জমিসহ পুরো ভবনের বাজারমূল্য আরও অনেক বেশি।
বসুন্ধরার বাইরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সহিদুলের নিজের, স্ত্রীর ও আত্মীয়দের নামে আরও ৩৩টি ফ্ল্যাটের সন্ধান মিলেছে। বাংলামোটর এলাকার স্বজন টাওয়ারে সহিদুলের নিজ নামে দুটি ফ্ল্যাট আছে। বাজারমূল্য প্রায় চার কোটি টাকা।
এ ছাড়া মিরপুর রূপনগর আরামবাগ আবাসিক এলাকায় স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে একটি ছয়তলা ভবন রয়েছে। সেখানে ১০টি ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ইস্কাটন গার্ডেন রোডের গার্ডেনিয়া টাওয়ারে ফাহমিদার নামে চার কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট আছে। এই ভবনে বেশিরভাগ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা বসবাস করেন।
মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় প্রজেক্টে স্ত্রীর নামে আরেকটি ছয়তলা ভবন নির্মাণ করেছিলেন সহিদুল। ২০ ফ্ল্যাটের ওই ভবনের বাজারমূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি। পরে ভবনটি চার শ্যালকের নামে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে কাগজপত্রে ভবনের মালিক হিসেবে রয়েছেন কাজী মুক্তাদীর ইবনু মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান ও কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনান। সব মিলিয়ে সহিদুল, স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি ও চার শ্যালকের নামে থাকা ৫৩টি ফ্ল্যাট এবং দুই দোকানের বাজারমূল্য অন্তত ১৬২ কোটি টাকা।
ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ছয়তলা বাড়ি
এ ছাড়া ইস্টার্ন হাউজিংয়ের আগুন্দা ২১ মৌজায় (খতিয়ান ১৪৩ ও ১৪৪) ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশের দুটি প্লটে প্লাস্টিক কারখানা ভাড়া দেওয়া। মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। মিরপুর বেড়িবাঁধের গড়ানচটবাড়ি মৌজায় (খতিয়ান ২৬৬৭) ৩৩ শতাংশ জমির দাম অন্তত ৩০ কোটি টাকা।
রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় ১২৭ নম্বর দোকানটি সহিদুলের নামে। এটির বাজারমূল্য আনুমানিক দুই কোটি টাকা। নিউমার্কেটের ২৬/২ নম্বর দোকানটিও তার। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, এটির দাম দুই কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ, দুটি দোকানের মোট মূল্য চার কোটি টাকার ওপরে।
শুধু রাজধানীতে নয়, ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারেও বিপুল সম্পদ গড়েছেন সহিদুল। মধুমতি মডেল টাউনে তার নামে একটি আলিশান বাংলোবাড়ি রয়েছে। বাড়িটির নাম ‘সেঁজুতি’। ৩৫ কাঠা জমির ওপর গড়ে ওঠা লাল ইটের এই ভবন নিয়ে স্থানীয়দের কৌতূহলের শেষ নেই।
এলাকাবাসী জানান, মাঝেমাঝে কয়েকটি গাড়ি এসে থামে। তবে ভবনের কেয়ারটেকার বা অন্য কেউ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন না। এলাকার বাজারদর অনুযায়ী, এই বাংলোবাড়ির শুধু জমির দামই আছে অন্তত ১০ কোটি টাকা।
গাবতলী থেকে আমিনবাজার পেরিয়ে দুই কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের পাশে ৫৫০ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে মধুমতি মডেল টাউন। সবুজে ঘেরা এই প্রকল্পে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের বিনিয়োগ রয়েছে। বেশিরভাগই বাংলোবাড়ি। কোনো প্লট ভাড়া দেওয়া বাস-কাভার্ডভ্যানের ওয়ার্কশপ হিসেবে। রয়েছে গরু-ছাগলের একাধিক খামার। এই প্রকল্পে সহিদুলের মালিকানায় রয়েছে পাঁচটি প্লট।
প্রকল্পের প্রধান ফটক পেরিয়ে বাঁ-দিকে প্রথম সড়কের দ্বিতীয় প্লটটি ২০ কাঠার। বর্তমানে গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়া। মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। কয়েকশ গজ সামনে ব্রিজ লাগোয়া ১২০ কাঠার প্লটে রয়েছে গরু, ছাগল ও ভেড়ার খামার। মূল্য ৩০ কোটি টাকা। ওই প্লটের পাশে ৬০ কাঠার আরেকটি প্লট এক্সকাভেটরসহ ভারী যন্ত্রপাতির গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়া। মূল্য ১৫ কোটি টাকা। ব্রিজ পেরিয়ে ১০ কাঠার একটি প্লটের দাম তিন কোটি টাকার বেশি। প্রকল্পের শেষ প্রান্তে ডানদিকে ১১০ কাঠা জমির দাম কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা। পাঁচটি প্লটে মোট জমি ৩২০ কাঠা। একসঙ্গে বাজারমূল্য অন্তত ৯০ কোটি টাকা।
পূর্বাচলে সহিদুল দম্পতির ছয়টি জমির কাগজপত্র পাওয়া গেছে। ডুমনি মৌজায় পিংক সিটিতে (খতিয়ান ১২০৪৬) ৩৩ শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। পূর্বাচল পাঁচ নম্বর সেক্টরের পিতলগঞ্জ মৌজায় (খতিয়ান ৪৪৬১) সাড়ে ১৬ শতাংশ জমির দাম ১৫ কোটি টাকার বেশি। দিঘলিয়া মৌজায় (খতিয়ান ২৬৩৩) ৩৩ শতাংশ জমির মূল্য অন্তত দুই কোটি টাকা। বাড়িয়াছনি মৌজায় (খতিয়ান ৫২৭২) সাত শতাংশ জমির মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি।
স্ত্রী ফাহমিদার নামে পূর্বাচলের মুশুরীগ্রাম মৌজায় (খতিয়ান ৪৩৪৩) ১৭ শতাংশ জমির মূল্য দুই কোটি টাকার বেশি। কামতা মৌজায় (খতিয়ান ২১৫০) সাত শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
গাজীপুরের কালিগঞ্জে পাড়াবর্থা-৮০ মৌজায় (খতিয়ান ২৭) সহিদুলের নামে ১৫ শতাংশ জমির কাগজ হাতে এসেছে। এই জমির দাম কোটি টাকারও বেশি।
স্থাবর সম্পদের বাইরে অস্থাবর সম্পদেও সহিদুল দম্পতির বিনিয়োগ কম নয়। ফাহমিদা রাব্বির নামে শেয়ারবাজারে একটি বিও অ্যাকাউন্টে (শেষ পাঁচ সংখ্যা ৬৯৭৫৪) প্রায় ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। সোনালী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে (শেষ চার সংখ্যা ০৭২৯) তার নামে নগদ ৫৫ লাখ টাকা জমা আছে বলেও নিশ্চিত হয়েছে।
স্বামী-স্ত্রীর বিপুল সম্পদের পাশাপাশি ছেলে হাসিন ফারহানের নামেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করে দিয়েছেন সহিদুল। বসুন্ধরার বিলাসবহুল জেসিএক্স বিজনেস টাওয়ারে অফিস খুলেছেন ফারহান। ভেলোসিটি গ্রুপের অধীনে ভেলোসিটি আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইন্টেরিয়র এবং ভেলোসিটি মার্কেটিং এজেন্সিসহ একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি। এই অফিসের জন্য ফারহানকে সহিদুল অন্তত পাঁচ কোটি টাকা দিয়েছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে।
এমন পদে সরকারি চাকরি করে কত টাকা আয় করা সম্ভব তা জানতে সহিদুলের সহকর্মী ছিলেন কিংবা কাস্টমস ক্যাডারের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা এমন কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করে। তাদের বর্ণনায়, চাকরি জীবনে সর্বসাকুল্যে বেতন বাবদ পান দেড় কোটি টাকার মতো। এর বাইরে স্কলারশিপ কিংবা বিদেশ সফর বাবদ আরো ১ কোটি টাকা। আর অবসরকালীন দেড় কোটি টাকা বা এরচেয়ে কিছু কমবেশি। অর্থাৎ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক খরচ বাদ দিয়ে কোন ভাবে আড়াই থেকে ৩ কোটি টাকার বেশি সঞ্চয় করা সম্ভব না। কিন্তু বাস্তবে সহিদুল ইসলাম দম্পতির যে সম্পত্তি তা এই হিসাবের অন্তত ১০০গুণ বেশি।
কর্মজীবনে সহিদুল ইসলাম এনবিআরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সদস্য, কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঢাকার (পশ্চিম) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারের মতো দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
এনবিআরের একটি সূত্র জানিয়েছে, এসব পদে থাকাকালে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। একাধিক সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশনের তারিখেও এই তথ্যের সত্যতা মেলে। সহিদুলের বেশিরভাগ সম্পত্তি ২০১০ সালের পর অর্জিত। অথচ এমন একজন কর্মকর্তার পুরো চাকরিজীবনের আয় কত হতে পারে?
একই গ্রেডের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও অন্যান্য সুবিধাসহ রাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা পাওয়া যায়। বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে সারা চাকরিজীবনের মোট আয় প্রায় তিন কোটি টাকা। নিজের ও পারিবারিক খরচ বাদ দিলে সর্বোচ্চ সঞ্চয়ের পরিমাণ হতে পারে কমবেশি তিন কোটি টাকা। কিন্তু সহিদুলের ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ কোথা থেকে এলো, সেই প্রশ্নের জবাব মেলে না।
একাধিকবার শহিদুল ইসলামের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তার মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলেও ধরেননি তিনি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলে দেখেছেন কোন উত্তর দেননি।
ধারাবাহিকভাবে চলবে নিউজ আগামী পর্বে আমরা জানাবো শহিদুল কোন কোন কোম্পানির সুবিধা নিয়েছিল এবং শহিদুলের কাছ থেকে কোন কোন কোম্পানি সুবিধা নিয়েছে শহিদুলের কোথায় কোথায় আরো সম্পদ রয়েছে ভাই এবং ছেলেদের কোথায় কি ধরনের সম্পদ রয়েছে।