জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব সীমিতের বিলে স্বাক্ষর করলেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রে ‘জন্মসূত্রে’ নাগরিকত্ব প্রাপ্তির সুযোগ সীমিত করল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। গতকাল বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত একটি প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন ডোনল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড, জলসীমা এবং আকাশসীমায় যেসব শিশু জন্ম নেবে— তারা সবাই জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। ১৮৬৮ সালে দেশটির গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গৃহীত হয়েছিল এই সংশোধনী।
এই সংশোধনীর একটি সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটও রয়েছে। অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতকের যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ বসতি স্থাপনকারীরা তাদের কৃষি খামারের কাজ এবং অন্যান্য শ্রমসাধ্য কাজকর্মের জন্য ক্রীতদাস হিসেবে আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার মানুষকে ধরে নিয়ে এসেছিল। ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতালাভের প্রায় ৯০ বছর পর ১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে। ১৮৬৮ সালে সেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৩ ও ১৪ তম সংশোধনী গৃহীত হয় মার্কিন সংবিধানে। ১৩ তম সংশোধনীতে দাসপ্রথার বিলোপ সাধন করা হয় এবং এবং দাসদের সন্তানের স্বার্থে ১৪তম সংশোধনীতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বকে স্বীকৃত দেওয়া হয়।
মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের এই সাংবিধানিক ধারার সুযোগ নিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দম্পতিদের যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের হার অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দম্পতিদের একমাত্র উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান ভূমীষ্ঠ করার মাধ্যমে নিজেদের সন্তানের মার্কিন নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা। এ ধরনের ভ্রমণকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক ভাষায় বলা হয় ‘বার্থ ট্যুরিজম’।
গতকাল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ‘বার্থ ট্যুরিজম’ সীমিত করতেই নতুন নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন ট্রাম্প। বর্তমানে বিদেশি কূটনীতিক এবং শত্রু দেশের নাগরিকরা এই সুবিধা পান না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বরাষ্ট্র ও আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার জানিয়েছেন, নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের জেরে যেসব বিদেশী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য এবং মার্কিন নাগরিকত্ব কেনার আশায় যেসব দম্পতি যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ইচ্ছুক— মূলত তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
বিলটি স্বাক্ষরের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময়ের সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমাদের জন্মগত নাগরিকত্বকে তারা পুরোপুরি কৌতুক বানিয়ে ফেলেছে। দশকের পর দশক ধরে এই ধারার অপব্যবহার হচ্ছে এবং এটা বন্ধ করা আমাদের দায়িত্ব।”
অভিবাসন বিষয়ক নিরপেক্ষ ও অলাভজনক মার্কিন গবেষণা সংস্থা দ্য সেন্টার অপর ইমিগ্রেশন স্টাডিজের অনুসারে, ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অন্তত ২০ থেকে ২৫ হাজার দম্পতি যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন সন্তান প্রসবের জন্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে।
২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হওয়ার প্রায় পরপরই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার সীমিতের উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু সেবার যুক্তরাষ্ট্রের দুই ফেডারেল আদালত (হাইকোর্ট) ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগে স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন। উভয় আদালত বলেছিলেন, প্রেসিডেন্টের এই আদেশ মার্কিন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ফেডারেল আদালতের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তার। গত ৩০ জুন সুপ্রিম কোর্ট সেই আপিল খারিজ করে দেন। সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারকের মধ্যে ৬ জনই আপিলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বর্তমানে মার্কিন-স্প্যানিশ মানবাধিকার ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা ইউনিডোস ইউএসের নির্বাহী ডেবোরাহ ফ্লেইসচাকার রয়টার্সকে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রে ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই প্রথা চলে আসছে এবং মাত্র ৫ সপ্তাহ আগে সুপ্রিম কোর্ট এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই নির্বাহী আদেশ আইনী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।”
সূত্র : রয়টার্স