স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জুতা হাতে নিয়ে মসজিদ থেকে বের হচ্ছে ওসি

ওসির হাতে নিজের জুতা, কিন্তু সারাদেশ জানল ‘স্বরাষ্টমন্ত্রীর জুতা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য সঙ্গে একটি ক্যাপশন এর পরই শুরু হলো তোলপাড়।
কয়েকদিন আগে যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী নাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জুতা হাতে নিয়ে মসজিদ থেকে বের হচ্ছেন।

কেউ লিখলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জুতা হাতে ওসি
কেউ সেটিকে আরও রসিয়ে উপস্থাপন করলেন। মুহূর্তের মধ্যে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল হাজার হাজার মানুষের টাইমলাইনে। শুরু হলো হাসাহাসি, কটাক্ষ, সমালোচনা। অথচ প্রশ্ন হলো, জুতাটি আসলে কার ছিল?
ঘটনাটি যাচাই করতে গিয়ে পাওয়া তথ্য বলছে, গল্পটা ভাইরাল হওয়ার মতো যতটা সহজ করে দেখানো হয়েছিল, বাস্তবতা ততটা সরল নয়।
বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন ১৩ আগস্ট দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেছে, ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জুতা বহন করেননি। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর হাতে থাকা জুতা ছিল তাঁর নিজের ব্যবহৃত সরকারি অক্সফোর্ড জুতা। সংগঠনটির দাবি, একটি আংশিক ভিডিওর দৃশ্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেই “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জুতা হাতে ওসি ধরনের প্রচারণা চালানো হয়েছে।

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিডিওতে দেখা ব্যক্তিকে শনাক্ত করে জানা যায় তাঁর নাম রেজাউল করিম এবং তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মী। রেজাউল করিমের বক্তব্য অনুযায়ী, মন্ত্রীর স্যান্ডেল তিনি নিজেই বহন করছিলেন। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জুতা বা স্যান্ডেল ওসি বহন করছিলেন, এমন দাবির সঙ্গে এই অনুসন্ধানেরও মিল নেই।

ভিডিওতে দেখা গেল ওসির হাতে জুতা, পাশে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর কেউ ধরে নিলেন, হাতে থাকা জুতাটি মন্ত্রীর। সেই ধারণার ওপর তৈরি হলো ক্যাপশন, ক্যাপশন দেখে অন্যরা আবার সেটিই সত্য ধরে শেয়ার করলেন। এক পর্যায়ে মূল ভিডিওর চেয়ে ক্যাপশনটাই হয়ে গেল সত্য।

একটি ভুল তথ্য যখন বারবার শেয়ার হয়, তখন সেটি অনেকের কাছে সত্য বলে মনে হতে শুরু করে।
এখানে আরেকটি বড় প্রশ্ন আছে,
মোবাইল ফোন হাতে থাকলেই কি এখন আমরা সবাই সাংবাদিক?

একটি ভিডিও ধারণ করা যায়। একটি পোস্ট লেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছানোও যায়। কিন্তু সাংবাদিকতা শুধু ভিডিও ধারণ বা পোস্ট করার নাম নয়, সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো নিউজ বা ভিডিও অথবা অডিও যাই হোক যাচাই করা ছাড়া কোন পেইজেই দেয়া উচিত নাই।

এই প্রশ্নগুলো করার পরেই একটি তথ্যকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা উচিত।
কারণ একটি ভুল ক্যাপশন শুধু একটি পোস্টকে ভাইরাল করে না, একজন মানুষের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ওসি শেখ মোহাম্মদ আলীকে নিয়েও সেটিই হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ ১০ আগস্ট, অর্থাৎ এই বিতর্কের কয়েক দিন আগেই মাদকবিরোধী অভিযানে সাফল্যের জন্য তিনি কক্সবাজারে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

সমালোচনা বন্ধ করার কথা বলছি না, বরং সমালোচনা আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত। কিন্তু সেটি হতে হবে তথ্যের ওপর ভিত্তিকরে।
ক্ষমতাবান ব্যক্তি হোন কিংবা একজন সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা, কারও বিরুদ্ধে কোনো কোন কিছু বলতে হলে আগে সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
আজ যে ভুল তথ্য একজন ওসির বিরুদ্ধে গেল, কাল একই পদ্ধতিতে আপনার বা আমার বিরুদ্ধেও যেতে পারে।
মোবাইল আমাদের প্রকাশের ক্ষমতা দিয়েছে, সত্য যাচাইয়ের দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয়নি। তথ্য প্রকাশ করতে কোন সমস্যা নেই। তবে যাচাই-বাছাই করে। একজন নিরীহ মানুষকে বেজ্জতি করার কোন অধিকার কেউ আমাদের দেয়নি।
ভাইরাল করার আগে যাচাই করুন
কারণ একটি ভুল ক্যাপশন কখনো কখনো একজন মানুষের বছরের পর বছর তৈরি করা সম্মানকে কয়েক ঘণ্টায় ধ্বংস করে দিতে পারে।

আরো