জুলাই সনদের পথেই এগোতে চায় বিএনপি: আইনমন্ত্রী

বিএনপি জুলাই সনদের পথেই এগিয়ে যেতে চায় বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে সংস্কার কার্যক্রমে সরকারকে গঠনমূলক চাপ দেওয়ার পাশাপাশি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার রাজধানীর সিরডাপ অডিটোরিয়ামে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক বহুদলীয় সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে গঠনমূলক চাপ প্রয়োজন। তবে সেই চাপ প্রয়োগের ভাষা ও পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্যদের সভা-সমাবেশ করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকা উচিত নয়।

তিনি বলেন, সরকার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। পরিবর্তনের গতি ধীর হতে পারে, তবে প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। গুমের একটি অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে শূন্য সহনশীলতা নীতি নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়, তবে সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে।

মানবাধিকার কমিশন প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো ও ক্ষমতা নিয়ে সরকার যাচাই-বাছাই করছে। মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা হচ্ছে। জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সরকার কাজ করছে এবং কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে সংশোধনের জন্য সরকার উন্মুক্ত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আইন কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নয়; আইন পরিবর্তনযোগ্য।’ এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হন। জুলাই সনদেও সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। যৌক্তিক প্রস্তাব এলে তা বিবেচনা করা হবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই, পেছনে ফিরতে চাই না। আমরা গুমের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।’ সরকারের কিছু দুর্বলতা রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। ‘আমাদের ভুল হতে পারে, তবে আমাদের চিন্তা স্বচ্ছ। বিএনপি জুলাই সনদের পথেই এগোতে চায়। আমাদের ওপর আস্থা রাখুন।’

সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে সংস্কারের জন্য, কোনো বিপ্লব হয়নি। রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা গেলে সংস্কারের কঠিন যাত্রা সুস্থ প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। সংস্কার কার্যক্রমে সব রাজনৈতিক অংশীজনকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, জাতীয় ঐক্য ও পরিচয় শক্তিশালী না হলে সংস্কার কার্যকর হবে না। বিচারক নিয়োগ, বিচারপ্রক্রিয়া ও পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির ফরিদুল হক বলেন, র‌্যাবের নাম পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্বহাল করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদের পথ থেকে বের হতে হলে তার বিপরীত পথে হাঁটতে হবে।

দলটির মনিরা শারমিন বলেন, রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের যে আস্থা তৈরি হয়েছিল, তা নষ্ট করা উচিত নয়। গণভোটের রায় বিএনপিকেই বাস্তবায়ন করতে হবে।

গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সরকারের ঘাটতি থাকলে জনগণ তা সহজেই বুঝতে পারবে। বাস্তবতার ভিত্তিতে সামগ্রিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, শুধু পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে গণভোটের রায়কে গুরুত্ব দিতে হবে।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বিদ্যমান কাঠামোতে ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে নেতিবাচক পরিবর্তন আসে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় সংলাপে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাসদের প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী, সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসান, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম ইকবাল হাসান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া।

বক্তারা স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার, মানবাধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ সংস্কার, নাগরিক নিরাপত্তা, মব ভায়োলেন্স, ব্যাংকিং খাতে আস্থা, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট রোডম্যাপের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

আরো