কক্সবাজার কি আবর্জনার ভারে হারাবে তার সৌন্দর্য?
প্রকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ—সৈকতকে গড়ে তুলতে হবে আন্তর্জাতিক মানের টেকসই পর্যটনকেন্দ্র
বাংলাদেশের গর্ব কক্সবাজার। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত এই অপরূপ উপকূল শুধু আমাদের পর্যটনসম্পদ নয়—এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, কাপ, প্লেট ও নানা ধরনের বর্জ্যে সৈকতের সৌন্দর্য এবং পরিবেশ ক্রমেই বিপন্ন হচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চে ঈদের পর মাত্র তিন দিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযানে কক্সবাজার সৈকত থেকে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের তিন দিন পর প্রায় ৩.৫ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসেন এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একই বছরের একটি পরিচ্ছন্নতা অভিযানে এক ঘণ্টায় ২৫০ কেজি প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য সংগ্রহের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। (United Nations Bangladesh)
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, গবেষণায় কক্সবাজার উপকূলে প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগ এবং প্লাস্টিক কাপকে উল্লেখযোগ্য সামুদ্রিক বর্জ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পর্যটন, মাছ ধরা ও আবাসিক কর্মকাণ্ডকে বর্জ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে গবেষকরা উপকূলীয় ও সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বলেছেন। (ScienceDirect)

সৈকত শুধু বালু ও সমুদ্র নয়
একটি সমুদ্রসৈকত একটি জীবন্ত প্রতিবেশ। বালুচর, সমুদ্র, সামুদ্রিক প্রাণী, পাখি, উপকূলীয় উদ্ভিদ এবং মানুষের জীবন-জীবিকা—সবকিছুই একটি আন্তঃসম্পর্কিত পরিবেশব্যবস্থার অংশ। আমরা যখন নির্বিচারে বর্জ্য ফেলি, তখন শুধু সৌন্দর্য নষ্ট করি না; দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও চাপ সৃষ্টি করি।
তাই কক্সবাজারের পরিবেশ রক্ষাকে কোনো সাধারণ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে জাতীয় পরিবেশ ও টেকসই পর্যটন অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ফেরিওয়ালাদের বিষয়ে মানবিক কিন্তু কঠোর নীতি প্রয়োজন
সৈকতে বিভিন্ন খাবার ও পণ্য বিক্রি করে বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের জীবিকার বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে সৈকতের পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে অনিয়ন্ত্রিতভাবে খাবার বিক্রি, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার এবং যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
আমার প্রস্তাব—সৈকতের বালুচর ও পরিবেশ-সংবেদনশীল এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান না রেখে নির্দিষ্ট, পরিচ্ছন্ন ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিক্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হোক। প্রতিটি বিক্রেতাকে বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া এবং পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। প্রয়োজনে বিক্রেতাদের বিকল্প নির্ধারিত স্থান ও প্রশিক্ষণ দিয়ে পুনর্বাসন করা উচিত।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি জরুরি আহ্বান
জেলা প্রশাসন, কক্সবাজার পৌরসভা, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন বোর্ড, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে একটি স্থায়ী “ক্লিন কক্সবাজার ও গ্রিন ট্যুরিজম মিশন” গ্রহণ করতে হবে।
সৈকতে পর্যাপ্ত বর্জ্যপাত্র, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার, প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পর্যটকদের মধ্যে “আমার সৈকত, আমার দায়িত্ব”—এই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ২০২৬ সালের UNDP-সমর্থিত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে স্থানীয় প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, পৌরসভা ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর যৌথ অংশগ্রহণ ইতোমধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। (UNDP)
বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে নতুন কৌশল প্রয়োজন
বাংলাদেশকে শুধু দেশীয় পর্যটনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এজন্য সরকারকে বিদেশি পর্যটকদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারের সক্রিয় অংশীদার করা যেতে পারে। বিদেশি ট্যুর অপারেটর, এয়ারলাইনস, হোটেল গ্রুপ, আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থা, ট্রাভেল মিডিয়া এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলে “Visit Bangladesh—Experience Cox’s Bazar” ধরনের আন্তর্জাতিক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কার্যক্রমে বিদেশে বাংলাদেশের মিশন ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন তথ্যসেবা ইতোমধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। (Bangladesh Tourism Board) একই সঙ্গে ILO-এর ২০২৫–২০২৭ কক্সবাজার Destination Development Plan পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পর্যটন উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। (International Labour Organization)
সরকার ২০২৬ সালে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে। এই পরিকল্পনায় উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। (The Daily Star)
আমরা এমন কক্সবাজার চাই, যেখানে সমুদ্র থাকবে নির্মল, সৈকত থাকবে পরিচ্ছন্ন, প্রকৃতি থাকবে সুরক্ষিত, স্থানীয় মানুষের জীবিকা থাকবে সম্মানজনক এবং বিশ্বের পর্যটকরা বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব গন্তব্য হিসেবে আবিষ্কার করবেন।
আজকের অবহেলা আগামী প্রজন্মের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই কক্সবাজার রক্ষার সময় এখনই।
লেখক
ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন এমবিই
মানবাধিকার সংগঠক, পরিবেশ, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
চেয়ারম্যান, New Hope Global, Birmingham, UK
