ব্যভিচার ও অপপ্রচার
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
সৌদি আরবের মক্কায় একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যভিচারের অভিযোগে দুই বাংলাদেশী নাগরিকের শিরচ্ছেদ (মৃত্যুদণ্ড) কার্যকর করা হয়েছে, যা নিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় ও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সৌদী রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে এই দুঃখজনক মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে অপপ্রচার ও চলছে সমানতালে, প্রতিদিন নতুন নতুন গুজব সৃষ্টি করা হচ্ছে। সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত আছেন। তাই যেকোনো অবিশ্বস্ত উৎস বা ফেসবুক-ইউটিউবের চটকদার থাম্বনেইল দেখে বিভ্রান্ত না হতে এবং অফিসিয়াল নিউজ পোর্টালগুলোর তথ্যের ওপর ভরসা রাখতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন। পাশাপাশি দূতাবাস বা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বহীনতা চিহ্নিত করে বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সৌদি আরবের তায়েফে অবস্থানরত Abdur Raqib Madani হাওইয়া দাওয়াহ সেন্টার এর একজন পরিচিত বাংলাদেশী দাঈ, গবেষক এবং লেখক। তিনি সম্প্রতি এ বিষয়ে যে সতর্কতামূলক বক্তব্য দিয়েছেন তা পাঠকদের জ্ঞাতার্থে হুবহু তুলে ধরা হলো- “এ নোংরা ও লজ্জাজনক বিষয়ে পোস্ট করতে না চাইলেও মিথ্যা বানোয়াট কথা ছড়ানোর প্রতিবাদে পোস্ট করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত দুজন – নজরুল ইসলাম এবং সিথি আক্তার। তারা উভয়ই বিন লাদেন কোম্পানিতে চাকরি করতো এবং তারা উভয়ই মক্কাতুল মোকাররামায় মসজিদুল হারামের পরিচ্ছন্ন কর্মী ছিল, মেয়েটির ভিলা ছিলো বাতহা কুরাইশ আর ছেলেটির ভিলা ছিলো হাইয়্যাল ইসকান।
ডিউটি করতে এসে তাদের মাঝে প্রেমের সম্পর্ক হয়ে যায় এবং তারা মসজিদুল হারামের ৮৫ থেকে ৮৭ নং গেটের মাঝের সিঁড়ির উপরে নির্জন কোঠায় তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়।
নজরুল ইসলাম তার এক ইন্ডিয়ান বন্ধুকে পাহারা দেওয়ার জন্য নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে। সেই বন্ধুটি এই ঘটনার ভিডিও করে। পরে সে নিজেও এই মেয়েটির সাথে ব্যভিচার করার আগ্রহ প্রকাশ করলে, যখন করতে পারে না বা তারা সম্মতি দেয় না, তখন এটা পাবলিশ করে দেয়। এরপরে ঘটনা জানাজানি হয়ে যায়। সৌদি প্রশাসন তিনজনকেই ধরতে সক্ষম হয়। ভারতীয় ভিডিও ধারণকারীর ২০ বছর কারাদণ্ড হয়, সে জেলে আছে এবং বাকি যে দুইজন প্রচার করেছে, ওদেরকে জেলে রাখা হয়েছে।
জীবিকার সন্ধানে নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে আসেন নভেম্বর, ২০২২ সালে এবং ২০২৩ সালের মে মাসে এই জঘন্য অপকর্মে ধরা পড়েন। সৌদি প্রশাসনের কাছে ধরা পড়ে তিনি জেলে ছিলেন ২০২৩ এর মে মাস থেকে। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে।
সৌদি নিয়ম অনুযায়ী সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে তার কফিল ও কোম্পানিকে জানানো।
অনেকেই প্রচার করছেন যে, তারা ওমরা করতে গেছিল, চুমু দিয়েছিল – এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্য বানোয়াট কথা। অবিবাহিত ছিল ঠিক আছে, কিন্তু অবিবাহিতের মৃত্যুদণ্ড কেন হবে এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটা মসজিদুল হারাম। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র জেনার শাস্তি নয়, তারা মসজিদুল হারামের হুরমাত, সম্মান নষ্ট করেছে। এর জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য সুপ্রিম কোর্টের বড় বড় বিচারকরা তাজীর (কাযী বা রাষ্ট্রের শাসকের বিবেচনার ভিত্তিতে অপরাধের জন্য শাস্তিকে বোঝায়) হিসাবে মৃত্যূদন্ড উপযুক্ত মনে করেছেন সেই শাস্তি দিয়েছেন। যা কুরআন ও সুন্নাহ সম্মত।
সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে, আমরা এটা নিয়ে এখনো নির্লজ্জের মতো মিথ্যা কথা বলছি। বাংলাদেশের রাম-বাম-নাস্তিক যারা, তারা তো বলতেই আছে, এমনকি যারা বাংলাদেশে ইসলামী আইন কায়েম করবো বলে, তাদের কেউ কেউ এই বিচারের বিরোধিতা করছে। কাজেই ভালো পরিবারের সন্তান হলে ব্যভিচারের সমর্থন দ্য়ো বন্ধ করুন, ওর পিতা মাতাকে নির্লজ্জের মত মিডিয়ায় কথা বলতে নিষেধ করুন। আল্লাহ হেদায়েত দান করুন।”
উপরোক্ত বক্তব্যে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট:
(১) ২০২৩ সালের মে মাস থেকে তারা বন্দী অবস্থায় ছিলেন। তাদের পরিবার বিষয়টি জানতেন। তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও তারা কেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে বিষয়টি অবহিত করেননি?
(২) তাদের কেউই উমরার জন্য যাননি, তারা সেখানে একটি প্রাইভেট কোম্পানির কর্মচারী ছিলেন।
(৩) প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব কিছু আইন আছে, প্রয়োগের ক্ষমতাও স্ব-স্ব রাষ্ট্রের এখতিয়ার। সৌদি সরকারের আইন অনুযায়ী তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে।
(৪) ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কনস্যুলার নোটিফিকেশন না দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তবে যেহেতু দেশটির বিচার ব্যবস্থা মূলত ইসলামী শরিয়া এবং বাদশাহর জারি করা রাজকীয় ডিক্রি বা বিধিমালার সমন্বয়ে পরিচালিত হয় সেখানে ভিয়েনা কনভেনশন মেনে চলার সূযোগ ক্ষীণ। ন্যায়বিচার, আইনের কঠোরতা ও সঠিক বাস্তবায়নের জন্য সৌদি আরবে অপরাধ খুবই কম।
(৫) পবিত্র মাসজিদে এমন জঘন্য ঘটনার ভিডিও ধারণকারী ভারতীয়কে ২০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে এবং তিনি সৌদি কারাগারে আটক আছেন।
(৬) সৌদি নিয়ম অনুযায়ী কফিলকে অবহিত করার কথা। কফিল’ হলেন তাদের নিয়োগকর্তা যিনি তাদের জামিনদার, জিম্মাদার, স্পন্সর বা দায়িত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তি। বিদেশী কর্মীদের ওপর
আইনি অবস্থা ও চলাচলের ওপর কফিলের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ থাকে।
এবার বাংলাদেশের নিজস্ব আইন এমন ঘটনায় কি বিধান রেখেছে জেনে নেই।
(১) দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৯৭ ধারা: বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি অনুযায়ী ব্যভিচার বা পরকীয়া একটি ফৌজদারি অপরাধ হলেও এর সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড।
(২) নারীদের অব্যাহতি: বাংলাদেশের আইনে ব্যভিচারের মামলায় শুধুমাত্র অপরাধে লিপ্ত পুরুষকে শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে, সংশ্লিষ্ট নারীকে শাস্তির আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
(৩) মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই: বাংলাদেশের আইনে ব্যভিচার বা পরকীয়ার জন্য শিরচ্ছেদ বা মৃত্যুদণ্ডের কোনো সুযোগ নেই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপরোক্ত ঘটনাটি নিয়ে একদিকে প্রবাসীদের বিদেশের আইন মেনে চলার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি উঠছে, অন্যদিকে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিকদের আইনি ও কনস্যুলার অধিকার রক্ষায় সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে, প্রবাসীদের কল্যাণে তাদের কাজ ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে-যেসব বিষয়ে সমন্বয়হীনতা আছে সেসব বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বেশি বাত চিত না করে স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ডে অধিক মনোনিবেশ করা দরকার। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ যোগ্য ব্যক্তিকে পদায়নের পাশাপাশি বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী তৃতীয় পক্ষের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে রহস্য উন্মোচন ও স্পষ্ট বক্তব্য দরকার। তবে সুবিধাবাদী তৃতীয় পক্ষ ব্যস্ত আছে কিভাবে বাংলাদেশের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্কের অবনতি ঘটানো যায়। অতএব, সৌদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রেখে ভ্রাতৃপ্রতীম রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পররাষ্ট্র নীতি মেনে চলতে হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে মুসলিম বিশ্বের বিশেষ সৌদি আরবের সম্পর্ক কালোত্তীর্ণ ও পরীক্ষীত- রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি অথর্ব ও অযোগ্যদের দ্বারস্থ হননি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পিতার অনুসৃত পথে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবেন এটাই প্রত্যাশা।
