ইসলামের সুমহান শিক্ষা: ক্ষমা ও উদারতা
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
ক্ষমা মহৎ গুণগুলোর মধ্যে অন্যতম। ক্ষমা প্রদর্শন করা আল্লাহভীরু মুমিনের মানবিক বৈশিষ্ট্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন- ‘আল্লাহভীরু তারাই, যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল হয়। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৪)। পৃথিবীতে যে মানুষ যত বেশি মহৎ, সে তত বেশি ক্ষমাশীল। ক্ষমা করলে ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। হজরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করলে সম্পদের ঘাটতি হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।’ (মুসলিম: ২৫৮৮)।
মানুষকে ক্ষমা করার ফজিলত
√আল্লাহর ক্ষমা লাভ: যে ব্যক্তি অন্যকে ক্ষমা করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার ভুল ক্ষমা করে দেন।
√সম্মান বৃদ্ধি: মানুষকে ক্ষমা করলে আল্লাহ তার সম্মান বাড়িয়ে দেন।
√সৎকর্মের প্রতিদান: ক্ষমা করা সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা সন্তুষ্ট হন।
√ক্রোধ সংবরণ: যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।
√উন্নত মর্যাদা: যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়াবনত হয় এবং অন্যকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাকে উন্নত করেন।
√শান্তি ও মুক্তি: মানুষকে ক্ষমা করলে অনেক মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং পরকালে মুক্তি লাভ করা যায়।
ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ সময়: তিন সময়ে ক্ষমা প্রার্থনা
করলে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি খুশি হন:
১) ইবাদত সম্পাদনের পর: এটি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের ইবাদতের কমতি পূরণ করতে পারি এবং আমাদের ইবাদতের কারণে অহংকার বা আত্মসন্তুষ্টি থেকে রক্ষা পেতে পারি।
কোরআনের শেষ দিকে নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে অবতারিত হওয়া আয়াত গুলির মধ্যে একটি, ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং তুমি মানুষদের আল্লাহর ধর্মে প্রবেশ করতে দেখবে, তখন তোমার প্রভুর প্রশংসা করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি তাওবা কবুলকারী।’ (সুরা নাসর, আয়াত: ১-৩)
এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে পৌঁছানোর পর, তিনি প্রতি নামাজের পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। নবীজি (সা.) প্রতিটি ভালো কাজ শেষ করার পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। হজ সম্পন্ন করার পর, তিনি মদিনার দিকে রওনা হওয়া শুরু করতেন এই বলে: ‘আমরা ফিরে যাচ্ছি তাওবা করে, ইবাদত করে এবং আমাদের প্রভুর প্রশংসা করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮১৫।
২) পাপ করার পর: আল্লাহ বলেছেন, ‘এবং যারা কোনো খারাপ কাজ করলে বা নিজেদের প্রতি অবিচার করলে, আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে—আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ মাফ করবে—তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করেন, যদি তারা সে পাপের দিকে ফিরে না যায়।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৫)
নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: ‘যদি আল্লাহর কোনো বান্দা পাপ করে, তারপর সঠিকভাবে অজু করে, দুই রাকাত নামাজ পড়ে, এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন।’ এরপর তিনি কোরআনের এই আয়াতটি পাঠ করেন, ‘যারা খারাপ কাজ করে বা নিজেদের প্রতি অবিচার করে…’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭১৫)
৩) গাফিলতিতে থাকার পর: সব মানুষই ভুল করে, এবং অধিকাংশই তারা যা করছে তার প্রতি গাফিল থাকে এবং গাফিলতিতে থেকে তারা আরও পথভ্রষ্ট হয়। যদি আমরা মহানবী (সা.)-এর উদাহরণ দেখি, তবে দেখতে পাব তিনি কখনোই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে গাফিল হতে দেননি। তিনি বলেছেন, ‘কখনো কখনো আমার মনে একটি পর্দা অনুভব করি এবং আমি একদিনে একশত বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,৭০২)
আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেন যারা তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি তাদের ক্ষমা করবেন। অবশ্যই, আমাদের পাপ থেকে বিরত থাকা চাই।
আল্লাহ্ আমাদের ক্ষমা করার ও ক্ষমার যোগ্য হবার তৌফিক দান করুন।
