আল্লাহ বলতেছেন, “অধিক পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে রেখেছে
আবুল কালাম মোহাম্মদ সামসুদ্দিন
কিছুদিন আগে রাতে বসে কোরআন পড়তেছিলাম।
একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম, হঠাৎ ফ্লো ভেঙে যায় তিরিশ পারার একদম শেষের দিকের একটা ছোট সূরা, সূরা তাকাসুরে এসে।
প্রথম দুইটা আয়াত পড়েই আমি রীতিমতো ভ্যাবাচেকা খাইছি!
আল্লাহ বলতেছেন,
“অধিক পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে রেখেছে (গাফলতির মধ্যে ফেলে রেখেছে)।”
“যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপস্থিত হও।” (সূরা তাকাসুর: ১-২)
আয়াত দুইটা পড়ে আমার মাথা কিছুক্ষণের জন্য পুরা ব্ল্যাংক হয়ে গেছিলো।
আমি আয়াতটার আরবি শব্দগুলো আবার দেখলাম- “হাত্তা যুরতুমুল মাক্বাবির”।
এখানে আল্লাহ ‘যুরতুম’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন।
‘যুরতুম’ মানে হলো জিয়ারত করা, ভিজিট করা বা বেড়াতে যাওয়া।
আমার মাইন্ড ব্লো হয়ে গেছে ঠিক এই জায়গাটাতেই!
আমি পুরা জিনিসটা আবার রিয়েলাইজ করার চেষ্টা করলাম।
আল্লাহ বলতে চাইতেছেন কি?!
মানুষ মারা গেলে কবরে যায়, সেখানে মাটি চাপা দেওয়া হয়।
কিন্তু আল্লাহ বলছেন, তোমরা কবরে “ভিজিট” করতে যাও!
ভিজিট তো মানুষ কিছুক্ষণের জন্য করে, পার্মানেন্টলি থাকার জন্য তো কেউ ভিজিট করতে যায় না!!!
আমি সাথে সাথে তাফসির সার্চ দিলাম। তাফসিরে ইবনে কাসির আর অন্যান্য কয়েকটা গ্রন্থ পড়লাম। তারপর আমার রিয়েলাইজেশনে যা আসলো, তা হলো:
কবর মানুষের শেষ গন্তব্য না!
কবর হচ্ছে জাস্ট একটা “ওয়েটিং রুম” বা ট্রানজিট লাউঞ্জ।
যেমন এয়ারপোর্টে মানুষ কিছুক্ষণ ওয়েট করে আসল ফ্লাইটে ওঠার জন্য, কবরটাও ঠিক তেমন।
আর আমরা বোকা মানুষরা দুনিয়াতে ভাবি, এই বুঝি সব শেষ!
এরপর আমি প্রথম আয়াতের “তাকাসুর” (التكاثر) শব্দটার তাফসির পড়লাম। আল্লাহ এখানে বলেন নাই যে “টাকা” তোমাদের ভুলিয়ে রেখেছে। আল্লাহ বলছেন “তাকাসুর” তোমাদের ভুলিয়ে রেখেছে। তাকাসুর মানে কী?
তাকাসুর মানে হলো- “ওর চেয়ে আমার বেশি লাগবে।”
এইটা কোনো বস্তুর নাম না, এইটা একটা মেন্টালিটি। একটা অসুস্থ মানসিক প্রতিযোগিতা।
আমার একটা ফোন আছে, কিন্তু ফ্রেন্ডের আইফোন প্রো ম্যাক্স দেখলে আমারও ওটা লাগবে।
আমার একটা ডিগ্রি আছে, কিন্তু অন্যের আরেকটা ভালো ডিগ্রি দেখলে আমারও সেটা লাগবে। ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু আরেকজনের বেশি থাকলে আমার আরো লাগবে।
ক্যারিয়ার, স্ট্যাটাস, স্যালারি- এই “আরো চাই, আরো চাই” করতে করতে আমাদের জীবনের আসল ফোকাসটাই আমরা হারিয়ে ফেলি।
এই সূরা শুরুই হইছে একটা সাইকোলজিক্যাল ওয়ার্নিং দিয়ে।
আল্লাহ মানুষকে বলতেছে, দেখো, একটা পশু শুধু ততটুকুই খায় যতটুকু তার ক্ষুধা মেটায়।
কিন্তু তুমি মানুষ, তোমার পেট ভরার পরও তুমি জমা করো, কারণ তুমি অন্যের চেয়ে নিজেকে বড় দেখাতে চাও।
এইটা কোনো সাধারণ কথা না, এইটা আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় crisis।
তাফসিরে বলা হয়েছে, “আলহাকুম” মানে এমন কোনো খেলা বা বিনোদন যা তোমাকে তোমার আসল ইমার্জেন্সি কাজ ভুলিয়ে দেয়।
ধরেন, আপনার কালকে ফাইনাল এক্সাম বা বিশাল কোনো প্রেজেন্টেশন, আর আপনি আজকে রাতে বসে নেটফ্লিক্সে সিরিজ দেখতেছেন।
এই সিরিজ দেখাটা হলো “আলহাকুম”।
আল্লাহ বলছেন, এই দুনিয়ার ক্যারিয়ার, ব্যাংক ব্যালেন্স, আর সেটেল হওয়ার টেনশন তোমাদেরকে আখেরাতের ফাইনাল এক্সামের কথা ভুলিয়ে দিয়েছে!
সবচেয়ে ভয়ংকর আয়াত আসে এরপর:
“কক্ষনো নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে।… সেদিন তোমাদেরকে অবশ্যই নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা তাকাসুর: ৩, ৮)
এখানে আল্লাহ আমাদের অভিযুক্ত করতেছেন না, আল্লাহ আমাদের বাস্তবতা দেখাচ্ছেন।
আমরা ভাবি আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমাদের টাকা নাই, আমাদের ভালো জব নাই, আমাদের অমুক জিনিসটা নাই।
কিন্তু সবচেয়ে গভীর Realisation, এই আয়াত আসলে বলতেছে: তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা তোমার অভাব না। তোমার সমস্যা হচ্ছে তুমি এক অলীক প্রতিযোগিতায় দৌড়াচ্ছো।
তুমি এমন একটা গন্তব্যের জন্য জিনিসপত্র প্যাকিং করতেছো, যেখানে তুমি থাকবাই না!
ফ্লো টা দেখেন:
১. মানুষ “আরো লাগবে” প্রতিযোগিতায় অন্ধ হয়ে দৌড়াচ্ছে।
২. সে আসল উদ্দেশ্য ভুলে গেছে।
৩. দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ একদিন সে কবরে গিয়ে ব্রেক কষে (ভিজিট করে)।
৪. কবরে যাওয়ার পর তার ঘোর কাটে, কিন্তু তখন আর ফিরে আসার সময় থাকে না।
৫. শেষমেশ তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হয় হিসাব দেওয়ার জন্য।
আমরা কেন রবকে ভুলে যাই?
কারণ আমাদের মস্তিষ্ক already occupied।
আমরা সারাদিন হিসাব করি কীভাবে আরো দুই টাকা বেশি কামানো যায়, কীভাবে সিভিটা আরো ভারি করা যায়, কীভাবে অন্যের চেয়ে একটু বেটার লাইফ লিড করা যায়।
এই ইঁদুর দৌড়ে আমরা আমাদের যৌবন শেষ করি, পরিবারকে সময় দিই না, নিজের আত্মার যত্ন নিই না।
সমস্যা এই না যে মানুষ পরিশ্রম করে।
ইসলাম তো পরিশ্রম করতে উৎসাহিত করে।
সমস্যা হইতেছে, মানুষ ভুল ট্র্যাকে দৌড়ায়।
আপনি একটা ট্রেনের টিকিট কেটেছেন চিটাগাং যাওয়ার জন্য, কিন্তু আপনি ভুলে উঠেছেন সিলেটের ট্রেনে।
এখন সেই ট্রেনের এসি বগিতে বসে আপনি যতই কমফোর্ট ফিল করেন না কেন, আপনি তো আপনার আসল গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন না!
সবচেয়ে বড় ভয় হইতেছে এইটাই যে, জীবনের এই পুরো সময়টা আমরা যে স্ট্যাটাস, যে টাকা, যে ক্যারিয়ারের জন্য দৌড়ালাম, কবরের ওই ওয়েটিং রুমে ঢোকার সাথে সাথেই সেই সবকিছুর ভ্যালু জিরো হয়ে যাবে।
জিরো!
সেদিন আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, “আমি তোমাকে যেই সময়, যেই এনার্জি আর যেই নেয়ামত দিয়েছিলাম, সেটার শুকরিয়া কোথায়?”
*আমরা সারা জীবন “সেটেল” হওয়ার স্বপ্ন দেখি।*
কিন্তু সূরা তাকাসুর আমাদের একটা ভয়ংকর সত্য মনে করিয়ে দেয় – দুনিয়াতে কেউ কখনো সেটেল হতে পারে না, যতক্ষণ না সে কবরের ওই ট্রানজিট লাউঞ্জে গিয়ে পৌঁছায়।