রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান এবং বনানীতেও শহিদুলের সম্পদের পাহাড়
স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক প্রভাবশালী সদস্য শহিদুল ইসলামের হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও আন্তর্জাতিক জালিয়াতির খোঁজে নেমে এবার নতুন ও আরও চাঞ্চল্যকর মোড় উন্মোচিত হয়েছে। দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা এই কর্মকর্তার সপরিবারে দেশত্যাগের অকাট্য প্রমাণ এখন আমাদের হাতে চলে এসেছে। শহিদুল ইসলাম তার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ঠিক কয়টার সময় বাংলাদেশ বিমানবন্দর ত্যাগ করেছিলেন, কোন সুনির্দিষ্ট এয়ারলাইনসের বিমানে এবং কত নম্বর ফ্লাইটে চড়ে দেশ ছেড়েছেন, সেই সমস্ত অকাট্য এভিয়েশন নথিপত্র এখন অনুসন্ধানকারীদের টেবিলে। একই সাথে বর্তমানে তিনি কোন দেশে, কোন গোপন আস্তানায় অবস্থান করছেন, তার নিখুঁত রুট ম্যাপ এখন পুরোপুরি উন্মোচিত। এই পলায়নের নেপথ্য কাহিনী প্রকাশের মাঝেই তার স্থাবর সম্পত্তির তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাজধানীর সবচেয়ে দামি ও অভিজাত এলাকা গুলশান এবং বনানী। অনুসন্ধানে প্রামাণ্যভাবে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে গুলশান এবং বনানীর মতো অতি ভিআইপি এলাকায় শহিদুলের নামে একাধিক বিলাসবহুল প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে। কেবল আবাসন খাতই নয়, দেশের বেশ কয়েকটি বড় ও নামী কোম্পানিতেও তার কোটি কোটি টাকার বেনামী ইনভেস্টমেন্ট বা গোপন শেয়ারের সন্ধান মিলেছে।
একদিকে যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তার পেছনে ছুটছে, ঠিক তখনই বিদেশে বসে শহিদুল ইসলাম দেশে থাকা তার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার এক চূড়ান্ত আইনি জালিয়াতির ছক কষেছেন। বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে চরম অবিশ্বাসের বৃত্তে থাকা শহিদুল ইসলাম তার নিজের দুই ভাই সেলিম ও জাকির এবং চার শ্যালক ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করেন না। ফলে আদালতের মাধ্যমে সম্পত্তি ক্রোক হওয়ার আগেই তিনি এই ছয়জন নিকটাত্মীয়ের নামে পেছনের তারিখ দেখিয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আম-মোক্তারনামা দিয়ে দেওয়ার সমস্ত নথিপত্র চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বিশ্বস্ত সহযোগীরা পাওয়ার নিয়ে আইনি ঝামেলা এড়িয়ে দেশের বাজারে আস্তে আস্তে সব ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রি করে দেবে এবং সেই বিক্রির শত শত কোটি টাকা অতি সহজে ও নিরাপদে পরিচিত আন্তর্জাতিক হুন্ডির চ্যানেলে এশিয়ায় শহিদুলের কাছে পাচার করে দেবে। চতুর এই কর্মকর্তা এর আগেই আইনি জটিলতা এড়াতে মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় প্রজেক্টে স্ত্রীর নামে নির্মিত ২০ ফ্ল্যাটের ছয়তলা ভবনটি কাগজে-কলমে তার চার শ্যালক কাজী মুক্তাদীর ইবনু মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান ও কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনানের নামে হস্তান্তর করে রেখেছেন। নথিপত্রে শ্যালকরা মালিক হলেও এর প্রকৃত সুবিধাভোগী শহিদুল নিজেই। এছাড়া তার দুই ভাই সেলিম ও জাকিরের নামেও রয়েছে অঢেল অবৈধ সম্পত্তি, যার মধ্যে সেলিম কাস্টমসে প্রভাব খাটিয়ে চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ এর দুটি লাইসেন্স সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন।
এই জালিয়াতি চক্রের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকের ১৬ নম্বর রোডের ৭৯-৮০ নম্বর বাড়িটি, যা শহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর বিশাল রাজকীয় অট্টালিকা নামে পরিচিত। এই ভবনের ২০টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের দেখাশোনা করা, ভাড়া উঠানো এবং সমস্ত বাণিজ্যিক কাজ মূলত শহিদুলের শ্যালকরাই সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই জি ব্লকের ‘শেল কবিতা’ ভবন ছাড়াও বসুন্ধরা আবাসিকের ভেতরেই তার বিশাল ল্যান্ড ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে বসুন্ধরার জি-ব্লকেই রয়েছে আরও ৬টি আবাসিক প্লট, আই-ব্লকে রয়েছে বিশাল আয়তনের বাণিজ্যিক ফ্লোর, এন-ব্লকে একাধিক প্লট এবং জে-ব্লকে রয়েছে ২০ কাঠার একাধিক অতি মূল্যবান বাণিজ্যিক প্লট।
এই বিশাল নতুন সাম্রাজ্যের পাশাপাশি তার পূর্বের দৃশ্যমান সমস্ত সম্পদ যেমন পূর্বাচল সংলগ্ন আমেরিকান সিটির ১০৪ কাঠা জমি, যার সত্যতা প্রকল্পের সাইট কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন এবং যেখানে আরও একশ’র বেশি এনবিআর কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ রয়েছে, তাও বিক্রির তালিকায় রয়েছে। এছাড়া ছোট ছেলে হাসিন ফারহানের বসুন্ধরার জেসিএক্স টাওয়ারের ভেলোসিটি আইটি ফার্মের কোটি টাকার অফিস, যার পার্টনার তাহির হাসান সাংবাদিকদের ফোন নম্বর ব্ল্যাকলিস্টে রেখেছেন, সেই সম্পদও এই জালিয়াতির আওতাভুক্ত।
সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের ৩৫ কাঠার রাজকীয় বাংলোবাড়ি ‘সেঁজুতি’ এবং ৩২০ কাঠার পাঁচটি বাণিজ্যিক প্লট ও গরুর খামার যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা, বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারের দুটি ফ্ল্যাট, শাহবাগ ও নিউমার্কেটের চার কোটি টাকার দোকান, মিরপুরে স্ত্রীর নামে থাকা ৩০ কোটি টাকার ভবন এবং পূর্বাচল, ডুমনি, পিতলগঞ্জ ও গাজীপুরের শত বিঘা জমি এই আমমোক্তারনামার মাধ্যমে বিক্রি করে হুন্ডিতে পাচারের ছক চূড়ান্ত করা হয়েছে। এনবিআরের এই শীর্ষ কর্মকর্তার আন্তর্জাতিক জালিয়াতি ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে পলায়নের সম্পূর্ণ চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।