গ্যাস-সংকটে নাকাল দেশ, ভোগান্তিতে নগরবাসী

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দেশের গ্যাস-সংকট কাটেনি। বরং দিন যত গড়াচ্ছে, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, বিদ্যুৎ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর প্রভাব ততই প্রকট হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় শিল্পকারখানার উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশে। অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি, বাসাবাড়িতে গ্যাসের তীব্র সংকট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে জনদুর্ভোগ।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগার ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকেই টার্মিনালটি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট। দুর্ঘটনার আগেও সরবরাহ ছিল ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। তবে টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর তা কমে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। ফলে চাহিদার প্রায় অর্ধেক ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ মেরামতের কাজ করছেন। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হতে আরও ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে। আগামী পাঁচ থেকে আট দিনের মধ্যে একটি বয়লার চালু করা গেলে আংশিকভাবে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। বিশেষ করে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের গ্যাসনির্ভর তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটওয়্যারসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের দাবি, অনেক কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। কিছু কারখানা ডিজেল বা এলপিজি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় শিল্প ও আবাসিক খাতে সংকট আরও বেড়েছে।

রাজধানীর মগবাজার, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কলাবাগান, ধানমন্ডি, বাড্ডা, বাসাবো, কাফরুলসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস থাকছে না। কোথাও গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস মিললেও সকালে আবার চাপ কমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় সারাদিনই নিম্নচাপ অথবা একেবারেই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

এ পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার কিংবা এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে কাঠের চুলায় রান্না করছে। এতে যেমন বাড়ছে ভোগান্তি, তেমনি বাড়তি খরচের চাপও পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও চরম সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক স্টেশন দিনের বড় অংশ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। যেসব স্টেশন খোলা রয়েছে, সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, একটি স্টেশন সচল রাখতে কমপক্ষে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে অনেক এলাকায় চাপ নেমে এসেছে মাত্র ৪ থেকে ৫ পিএসআইতে।

হাজারীবাগ, লালবাগ, ওয়ারী, বংশাল, ইসলামপুর, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, কোতোয়ালি ও সদরঘাটসহ পুরান ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। কোথাও গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও তা দিয়ে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে অনেক পরিবার বাইরের খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের টিফিন প্রস্তুত করতে পারছেন না, কেউ কেউ না খেয়েই কর্মস্থলে যাচ্ছেন।

ইস্কাটন এলাকার বাসিন্দা রাজু হোসেন বলেন, “দীর্ঘ তিন-চার দশকের বসবাসে এমন ভয়াবহ গ্যাস সংকট কখনো দেখিনি।”

সূত্রাপুরের বাসিন্দা আয়েশা বলেন, “সকালে গ্যাস না থাকায় বাচ্চাদের কলা-বিস্কুট খাইয়ে স্কুলে পাঠাতে হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে হিটারে রান্না করেছি। প্রতিদিন এভাবে চললে বিদ্যুৎ বিলও অনেক বেড়ে যাবে।”

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীর প্রায় সব সিএনজি ফিলিং স্টেশনেই দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা গেছে। কোথাও স্টেশন খোলা থাকলেও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, আবার কোথাও ‘গ্যাস নেই’ সাইনবোর্ড টানিয়ে স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।

উত্তরার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ স্টেশন বন্ধ রয়েছে। এয়ারপোর্ট এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনের কর্মকর্তা জানান, বিক্রি বন্ধ থাকায় সিএনজির লাইন কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

সবুজবাগের মালিবাগ হাজীপাড়ার একটি সিএনজি স্টেশনে দুপুরের পর ‘গ্যাস নাই’ সাইনবোর্ড টানিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেখানে শতাধিক যানবাহন গ্যাসের অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

সিএনজিচালক মো. আমির হামজা বলেন, “সকাল ১০টা থেকে লাইনে আছি। গেটের সামনে এসে শুনলাম গ্যাস শেষ। বিকেল হয়ে গেল, এখনো জানি না গ্যাস পাব কি না।”

ডেমরা, উত্তরা ও মিরপুর এলাকায় চালকদের অভিযোগ, গ্যাস না পাওয়ায় প্রতিদিনের জমার টাকা তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক চালক বাধ্য হয়ে যাত্রীভাড়া বাড়িয়েছেন।

সিএনজিচালক কল্লোল বলেন, “প্রতিদিন মালিককে ১ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয়। গ্যাস না পেলে গাড়ি চালাব কীভাবে? নিজের খরচও উঠছে না।”

মিরপুরের একটি সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনের কর্মী জানান, পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় একটি মাত্র কমপ্রেসার চালিয়ে সীমিত পরিসরে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে এবং স্টেশন পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

পুরান ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় গ্যাস সংকটের পাশাপাশি লোডশেডিংও বেড়েছে। ফলে একদিকে গ্যাসের অভাবে রান্না করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতেও সমস্যা হচ্ছে। এতে নগরজীবনের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীর আবাসিক গ্রাহক, পরিবহন খাত এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে।

গ্যাস-সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমে গেছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত ও সরকারি ছুটির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় বড় ধরনের লোডশেডিং এড়ানো গেছে। তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং শিল্পকারখানা পুরোপুরি চালু হলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। তখন লোডশেডিংয়ের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে গত এক দশক ধরে গ্যাসের চাহিদা, অনুসন্ধান, উৎপাদন ও আমদানির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে স্থানীয় উৎপাদন বা এলএনজি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে।

এদিকে এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে বলেই সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

আরো