সার নিয়ে সুখবর, দেশে চাহিদার চেয়েও মজুত ১৬ লাখ টন বেশি

দেশে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে রবি ও বোরো মৌসুমে সারের চাহিদার তুলনায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন বেশি সরবরাহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে কৃষকের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার জেলাভিত্তিক চাহিদার বিপরীতে শতভাগ সার বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে।

সরকারি হিসাবে, দেশে সারের চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে প্রস্তুত সরবরাহ ৫১ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। ফলে চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত সরবরাহের প্রস্তুতি রয়েছে। এর পাশাপাশি আগামী অক্টোবর মাসের জন্য ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের নির্ধারিত চাহিদার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে সমপরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার ১৪ সেপ্টেম্বরের এক চিঠি ও সংযুক্ত জেলাওয়ারি বরাদ্দ তালিকা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। নথিতে ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের চাহিদার বিপরীতে বিভিন্ন উৎস থেকে সার বরাদ্দ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

তথ্যানুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশের ৬৪ জেলার জন্য টিএসপি সারের মোট চাহিদা ৭০ হাজার ৫২ মেট্রিক টন এবং পুরো পরিমাণই বিএডিসির মাধ্যমে বরাদ্দ করা হয়েছে। একইভাবে ডিএপি সারের মোট চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বিসিআইসি ১ হাজার মেট্রিক টন এবং বিএডিসি ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন বরাদ্দ করেছে। অর্থাৎ চাহিদার পুরো পরিমাণই বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ ছাড়া অক্টোবর মাসে এমওপি সারের মোট চাহিদা ৯৩ হাজার ৬৫৪ মেট্রিক টন এবং সমপরিমাণ সারই জেলাওয়ারি বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে তিন ধরনের নন-ইউরিয়া সারের অক্টোবরের মোট জেলাভিত্তিক চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ১৪ হাজার ৬১৬ মেট্রিক টন, যার বিপরীতে সমপরিমাণ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের নথিতে দেখা যায়, চাহিদার ভিত্তিতে প্রতিটি জেলার জন্য আলাদা পরিমাণ নির্ধারণ করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনো একক কেন্দ্রীয় বরাদ্দের পরিবর্তে মাঠ পর্যায়ের কৃষি চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে জেলাভিত্তিক সরবরাহ পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ব্যবস্থাকে কৃষকের প্রয়োজনের সঙ্গে সার সরবরাহের সরাসরি সমন্বয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সার সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে বর্তমান সরকার শুধু জেলাভিত্তিক বরাদ্দের ওপর নির্ভর না করে আমদানির ধারাবাহিকতাও বজায় রেখেছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং কৃষকদের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে মোট ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি, ডিএপি ও ইউরিয়া সার আমদানির তিনটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর মধ্যে বেলারুশ থেকে ৩০ হাজার টন এমওপি, মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি এবং সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়।

এর আগে আগস্টেও বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া এবং রাশিয়া থেকে এমওপি আমদানির প্রস্তাব ছিল।

এ ছাড়া সার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে চলতি বছর জাতীয় পর্যায়ে সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটি গঠন এবং ৬৪ জেলায় সার মনিটরিং সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া ৪ লাখ ১৮ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন, ডিএপি ৩ লাখ ২ হাজার টন এবং এমওপি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টন মজুত ছিল।

পাশাপাশি পরিবহনের পথে ছিল টিএসপি ১ লাখ ২৮ হাজার ২০০ টন, ডিএপি ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ টন এবং এমওপি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪০০ টন। ৬৪ জেলায় সার মনিটরিং সেল গঠনের তথ্যও সংসদে জানানো হয়েছে।

বর্তমান বিএনপি সরকারের সার ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া হচ্ছে চাহিদা নিরূপণ, জেলা-ভিত্তিক বরাদ্দ, আগাম আমদানি, পরিবহনাধীন মজুত এবং মাঠ পর্যায়ের মনিটরিং—এই সমন্বিত ব্যবস্থার ওপর। ২০২৬ সালের সমন্বিত সার ডিলার ও বিতরণ নীতিমালাও এ ব্যবস্থাপনার অংশ।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নথিতে আগামী অক্টোবরের জন্য ৬৪ জেলার চাহিদা আলাদাভাবে বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির ক্ষেত্রে চাহিদার বিপরীতে পূর্ণ বরাদ্দ নিশ্চিত হওয়ায় সরবরাহ ঘাটতির ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি কৃষকের প্রয়োজনের সময় সার পাওয়ার সুযোগ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ সার। ফলে উৎপাদন মৌসুমের আগে জেলা-ভিত্তিক চাহিদা নির্ধারণ করে আগাম বরাদ্দ দেওয়া এবং একই সঙ্গে আমদানি ও মজুত নিশ্চিত করার বর্তমান উদ্যোগকে কৃষি খাতে সরকারের আগাম প্রস্তুতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সার ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে উঠে আসছে—‘চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ, আগাম আমদানি এবং মাঠ পর্যায়ে সরাসরি মনিটরিং’। বিএনপি সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে অক্টোবরের জেলাভিত্তিক শতভাগ সার বরাদ্দকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, সার ব্যবস্থাপনায় বর্তমান সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হচ্ছে চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা ও আগাম প্রস্তুতি। শুধু সার আমদানি বা মজুত করাই নয়, কোন এলাকায় কতটুকু সার প্রয়োজন, কখন প্রয়োজন এবং কীভাবে তা কৃষকের কাছে পৌঁছানো হবে— এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে মাঠপর্যায়ে সার সরবরাহ ও বিতরণ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কৃষকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার সার সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে দেবে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে সার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। কোথাও চাহিদার তুলনায় সরবরাহে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বলেন, কৃষকের প্রয়োজনের সময় সার নিশ্চিত করতে সরকার শুরু থেকেই আগাম ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে জেলাভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। অক্টোবর মাসের জন্য টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের চাহিদার বিপরীতে শতভাগ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে সার নিয়ে কৃষকের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সচিব বলেন, কিছু জায়গায় বিতরণে অনিয়ম হওয়ায় কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সরকারের তৎপরতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে সমস্যার দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়েছে।

তিনি বলেন, সার ব্যবস্থাপনায় সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে এবং ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দেওয়া। এজন্য আমদানি, মজুত, জেলাভিত্তিক বরাদ্দ, পরিবহন ও বিতরণ—প্রতিটি ধাপ সমন্বিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোথাও কোনো ঘাটতি বা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সচিব আরও বলেন, কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সার সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে উৎপাদন মৌসুমের আগেই চাহিদা নির্ধারণ ও বরাদ্দ নিশ্চিত করা হচ্ছে, যাতে কৃষককে শেষ মুহূর্তে সার সংগ্রহের জন্য বাড়তি চাপ বা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে না হয়।

তিনি বলেন, সরকারের এ উদ্যোগের ফলে একদিকে কৃষকের আস্থা বাড়বে, অন্যদিকে সময়মতো সার প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা সম্ভব হবে। কৃষক ভালো থাকলে কৃষি ভালো থাকবে, আর কৃষি ভালো থাকলেই দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় কৃষি মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

আরো