ড্রেনেজ ছাড়া আর রাস্তা নয়, তিন বছরে রাস্তা নষ্ট হলে ঠিক করবেন ঠিকাদার

রাস্তা নির্মাণের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বসতি এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া কোনো সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পুরো সড়কজুড়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ড্রেনেজ ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো রাস্তা নির্মাণ করা যাবে না।

একই সঙ্গে নির্মাণের পর তিন বছরের মধ্যে রাস্তা বা অন্য কোনো অবকাঠামোয় বড় ধরনের ত্রুটি বা ক্ষতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকেই তা ঠিক করে দিতে হবে। এ জন্য প্রকল্পের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অবকাঠামোর গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ সচিবালয়ে একনেকের পঞ্চম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এখন যেকোনো ধরনের অবকাঠামো, স্থাপনা ও রাস্তাঘাট নির্মাণে টেকসই ও গুণগত মানকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কোনো রাস্তা নির্মাণের পর তিন বছরের মধ্যে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে ঠিকাদারকে সেটি পুনরায় ঠিক করে দিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় গ্যারান্টি বা দায়বদ্ধতার শর্ত চুক্তিতে রাখা হবে। এটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় নয়; নির্মাণের মানের কারণে বড় ধরনের ক্ষতি হলে ঠিকাদারকেই তার দায়িত্ব নিতে হবে।

তিনি বলেন, গ্রামীণ পর্যায়ে রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে বড় একটি সমস্যা হলো ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা। ফলে বৃষ্টির পানি জমে রাস্তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে ভবিষ্যতে বসতি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া যেকোনো রাস্তার পরিকল্পনার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখতে হবে। ড্রেনেজের সুবিধা না রেখে আর কোনো রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হবে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পে এ নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগও রাখা হয়েছে। এ প্রকল্পে শুধু রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ নয়, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গেও সমন্বয় করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরুর দুই বছরের মধ্যে বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য এসটিপি এবং এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না ড্রেন বা পয়োনিষ্কাশন লাইন দিয়ে পানি কোথায় যাবে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। নদীতে পানি যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় পরিশোধন ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ কারণে এসটিপির সঙ্গে পয়োনিষ্কাশন লাইনকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রকল্পের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রংপুর সিটি করপোরেশনসহ পুরো জেলার মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ চলায় সেই মাস্টার প্ল্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। একইভাবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন জোনে রাস্তা, ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণের প্রকল্পেও টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

সভায় শুধু নির্মাণের মান নয়, প্রকল্পের ব্যয় কমানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে গাড়ি কেনার ব্যবস্থা বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কনসালটেন্সি ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জনবল থাকার পরও অপ্রয়োজনীয়ভাবে কনসালটেন্সি ব্যয় বাড়ানো যাবে না বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

একনেক সভায় রেলের সক্ষমতা বাড়াতেও বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ রেলের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ কেনার ২ হাজার ৭৬৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে মিটারগেজ রেলপথের পরিমাণ প্রায় ৬৫ শতাংশ। প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভের ঘাটতির কারণে ইতিমধ্যে কিছু রুট স্থগিত, বাতিল বা কমিয়ে দিতে হয়েছে। পণ্য পরিবহনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বর্তমানে আরও প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি লোকোমোটিভের প্রয়োজন রয়েছে। প্রথম ধাপে ৩০টি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংগ্রহ এবং সৈয়দপুর ও পার্বতীপুরে এগুলো তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে মিটারগেজ রেলপথকে ধীরে ধীরে ডুয়েল গেজ বা স্ট্যান্ডার্ড গেজে রূপান্তরের বিভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ আরও দ্রুত করার জন্য নতুন রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগে ডুয়েল গেজের কাজও এগিয়ে চলছে বলে জানান তিনি।

নারী উদ্যোক্তা তৈরিতেও নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রকল্পে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ন্যূনতম পুঁজি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক কম এমন উপজেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রকল্পটি সরকারের ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ ধারণার সঙ্গেও যুক্ত করা হবে। তবে আরও কিছু উপজেলা যুক্ত করে প্রকল্পটি সংশোধনের পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবার একনেকে উপস্থাপন করা হবে।

এদিকে রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্পও অনুমোদন দিয়েছে একনেক। ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।

সভায় রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে আট ঘণ্টার ব্যাটারি স্টোরেজ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবে এ ব্যবস্থা ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর প্রকল্পটি সংশোধন করে ব্যাটারি স্টোরেজ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানানো হয়েছে। বর্তমানে ব্যাটারি ছাড়া বিদ্যুতের সম্ভাব্য ইউনিট খরচ ছয় থেকে সাত টাকার মধ্যে হতে পারে বলে সভায় জানানো হলেও আট ঘণ্টার ব্যাটারি যুক্ত হওয়ার পর চূড়ান্ত খরচ নতুন করে নির্ধারণ করা হবে।

সব মিলিয়ে গতকালের একনেক সভায় মোট ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১০ হাজার ৬০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে ১০টি নতুন, দুটি সংশোধিত এবং একটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও আটটি সহায়ক নৌযান কেনা এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণের তৃতীয় সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় ফ্রান্সের প্যারিসে কেনা চ্যান্সারি ভবন সংস্কার ও আধুনিকায়নের প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতায় দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ এবং থানচি-রিমাক্রি-মাদাক-লিক্রি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনও অনুমোদন করা হয়েছে। এছাড়া জয়পুরহাটের নন্দাহার ও হারাবতী নদী এবং নুনগোলা ও খারোয়া খাল পুনঃখননের ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের একটি প্রকল্প পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি সভায় অবহিত করা হয়।

আরো