বিদেশে চিকিৎসার খরচ শুধু হাসপাতালের বিল নয়

চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সময় আমরা সাধারণত প্রথমেই হাসপাতালের বিলের হিসাব করি। কত টাকা লাগবে, চিকিৎসকের ফি কত, কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে—এসব প্রশ্ন সামনে আসে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে বিদেশে চিকিৎসার প্রকৃত খরচ শুধু হাসপাতালের বিল দিয়ে হিসাব করা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে বিমানভাড়া, ভিসা, থাকা-খাওয়া, স্থানীয় যাতায়াত, সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যদের খরচ, কাজ থেকে অনুপস্থিত থাকার আর্থিক ক্ষতি এবং চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে পরবর্তী পরিচর্যার ব্যয়ও।

বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি বড় ভুল হতে পারে শুধু হাসপাতালের দেওয়া আনুমানিক খরচ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। একটি চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলে যাতায়াত, থাকা, খাবার এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যয় যোগ হয়। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা হলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে। একজন রোগীর সঙ্গে যদি পরিবারের এক বা দুইজন সদস্যকে দীর্ঘ সময় থাকতে হয়, তাহলে সেই সময়ের আর্থিক মূল্যও কম নয়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার সময়ের চেয়ে পরবর্তী পরিচর্যার সময়ও দীর্ঘ হতে পারে।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বিদেশে চিকিৎসা করানোর পর দেশে ফিরে কী হবে? প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কোথায় হবে? ওষুধ ও পরবর্তী চিকিৎসা কে দেখবেন? বিদেশের চিকিৎসকের দেওয়া পরামর্শ স্থানীয় চিকিৎসকের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে শুধু বিদেশে যাওয়ার খরচ হিসাব করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। কারণ চিকিৎসা কোনো একদিনের ঘটনা নয়; বিশেষ করে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

তবে খরচ বেশি বা কম—এটিকে চিকিৎসার মানের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। বেশি খরচ মানেই ভালো চিকিৎসা নয়, আবার কম খরচ মানেই খারাপ চিকিৎসা নয়। রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কোথায় উপযুক্তভাবে পাওয়া যাবে, কোন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন, কী ধরনের প্রযুক্তি দরকার, চিকিৎসা কতটা নিরাপদ এবং পরবর্তী পরিচর্যা কীভাবে হবে—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কার্যকর, নিরাপদ, মানুষকেন্দ্রিক, সময়োপযোগী ও সমন্বিত চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেয়।

আমার কাছে তাই বিদেশে চিকিৎসার প্রশ্নটি শুধু “কত টাকা লাগবে?”—এতটা সরল নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—“বিদেশে গেলে পুরো চিকিৎসাযাত্রায় মোট কত খরচ হবে এবং সেই ব্যয়ের বিনিময়ে রোগী কী ধরনের চিকিৎসা ও পরবর্তী পরিচর্যা পাবেন?”

একই সঙ্গে সময়ের মূল্যও বিবেচনা করা দরকার। বিদেশে চিকিৎসার জন্য একজন রোগী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকতে হতে পারে। এতে কাজ, ব্যবসা বা পারিবারিক দায়িত্ব থেকে দূরে থাকার আর্থিক ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। এই ব্যয়গুলো হাসপাতালের বিলের মধ্যে থাকে না, কিন্তু পরিবারের জন্য এগুলো বাস্তব খরচ।

আবার এমনও হতে পারে, যে চিকিৎসার জন্য একজন রোগী বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবছেন, সেটি দেশের মধ্যেই উপযুক্তভাবে করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার অতিরিক্ত ভ্রমণ, থাকা এবং সময়ের ব্যয় এড়ানো যেতে পারে। আবার কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য সত্যিই দেশের বাইরে যাওয়া প্রয়োজন হলে, সেই সিদ্ধান্তও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত। অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদেশে যাওয়া বন্ধ করা নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক জায়গা বেছে নেওয়া।

আমার দৃষ্টিতে, বিদেশে চিকিৎসার আগে একটি পরিবারের হাতে শুধু হাসপাতালের আনুমানিক বিল থাকা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পুরো চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ, সময়, চিকিৎসার ধাপ এবং দেশে ফিরে পরবর্তী পরিচর্যার একটি পরিষ্কার ধারণা। চিকিৎসার সিদ্ধান্ত যত বড়, এই হিসাবও তত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বিদেশে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয়—“হাসপাতালের বিল কত?” আরও কয়েকটি প্রশ্ন করা দরকার—চিকিৎসাটি কোথায় সবচেয়ে উপযুক্তভাবে করা যাবে? পুরো চিকিৎসায় মোট কত খরচ হতে পারে? কতদিন সময় লাগবে? পরিবারের ওপর এর প্রভাব কী হবে? এবং চিকিৎসা শেষে পরবর্তী পরিচর্যা কোথায় ও কীভাবে হবে?

কারণ বিদেশে চিকিৎসার প্রকৃত খরচ শুধু হাসপাতালের বিল নয়। এর মধ্যে আছে ভ্রমণ, থাকা, সময়, পরিবারের ব্যয়, কাজের ক্ষতি এবং চিকিৎসা শেষে দীর্ঘ পথের খরচও।
শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার জায়গা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু খরচ নয়, আবার শুধু দেশের নামও নয়।

প্রয়োজনের সঙ্গে চিকিৎসার সক্ষমতা, খরচ এবং পুরো চিকিৎসাযাত্রার বাস্তব হিসাব—এই সবকিছুর সমন্বয়েই একটি সচেতন সিদ্ধান্ত তৈরি হয়।

মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম

আরো