লেঃ কর্ণেল জিয়াউদ্দিন বীর উত্তম: আধিপত্যবাদী শক্তি বিরোধী প্রথম সাহস

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ কর্ণেল জিয়াউদ্দিন (নভেম্বর ১৯৩৯ – ৫ আগষ্ট ২০২৫) ৭১ এর রণাঙ্গনে দুঃসাহসী অবদানের জন্য তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন।
কর্ণেল জিয়াউদ্দীন শুধু খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন এক সাহসী ও সরব কন্ঠ। স্বাধীনতার পর ভারতের সাথে তদানীন্তন শেখ মুজিব সরকারের ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির বিরোধিতা করে ১৯৭২ সালের ২০ অগাস্ট সাপ্তাহিক হলিডেতে তিনি লিখেছিলেন এক সাড়াজাগানো নিবন্ধ।
‘হিডেন প্রাইড অফ ফ্রিডম ফাইটার্স’ শিরোনামের ওই লেখা তিনি লিখেছিলেন সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায়। ঢাকার ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার থাকাবস্থায় তাঁর এই লেখা পড়ে শেখ মুজিবুর রহমান চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। সকল মহলে কর্নেল জিয়াউদ্দিনের সেই লেখা ভূমিকম্প সৃষ্টি করে। তাঁকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। তিনি দেশের সার্বভৌমত্বের কথা বলে ক্ষমা চাননি। তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তিনি চলে যান আন্ডারগ্রাউন্ডে, যোগ দেন সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টিতে। মুজিব সরকার বহু চেষ্টা করেও তাঁর সন্ধান পায়নি।
নিজের চাকরির পরোয়া না করে কর্নেল জিয়াউদ্দিনের মতো আর কেউ সেসময় গোলামি চুক্তির বিরোধিতা করার হিম্মত দেখাতে পারেননি। ১৯৭১ সালে জাতির ক্রান্তিকালে তিনি তাঁর দায়িত্ব যেমন পালন করেছেন,তেমনি স্বাধীন দেশের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতেও নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।
বছরের পর বছর ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে তাকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়।
শেষ জীবনে তিনি সেনাবাহিনী সহ সকলের শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়ে অন্তত তাঁর দেশপ্রেমের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।তবে তিনি কখনোই আত্মপ্রচার করতেন না। মুক্তিযুদ্ধকে পণ্য বানিয়ে সুবিধাও নিতেন না।
কক্সবাজার জেলার চকরিয়ার সন্তান লেঃ কর্ণেল মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বীর উত্তম সারগোদার পিএএফ স্কুল থেকে সিনিয়র ক্যামরিজ পাশ করে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমির ২৫তম পিএমএ লং কোর্সে যোগদান করেন। ট্রেনিং শেষ করে কমিশন পান ১ম ইষ্ট বেঙল রেজিমেন্টে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে সাহসীকতার সাথে যুদ্ধ করেন এবং লাহোর রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্লাটুন কমান্ডার হিসেবেও কাজ করেন। খুব কম সংখ্যক পূর্ব পাকিস্তানি অফিসার পিএমএ’র প্লাটুন কমান্ডার হতে পেরেছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া ছিলেন এমন আরেকজন।
১৯৭১ সালে জুলাই মাসে পাকিস্তানের এবোটাবাদ সেনানিবাস থেকে মেজর মঞ্জুর, মেজর তাহের ও ক্যাপ্টেন পাটোয়ারী সহ তারা ৪ জন ভারতে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। তখন তিনি তার আগের ইউনিট ১ ইষ্ট বেঙল রেজিমেন্টের অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহন করেন। কামালপুরের ২য় পর্বের যুদ্ধ, শ্রীমঙ্গলের কেজুরিছড়া পাক ঘাঁটি মৌলভীবাজারের ফুলতলা পাক ঘাঁটি, পাক ধলাই বিওপি, আটগ্রাম পাক ঘাঁটি , চারখাই এবং শেষে সিলেটের এমসি কলেজের কাছে পাকবাহিনীকে ধরাশায়ী করে সিলেটের উপকন্ঠে পৌছান। তার এই বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। একজন শিক্ষাবিদ হিসাবে তিনি
প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম এবং নেতৃত্বের গুণাবলী দিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন। একজন অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি কেবল শিক্ষাদান করেননি, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, নৈতিকতা এবং নেতৃত্ব গুণের বিকাশ ঘটিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে গেছেন।
৫ অগাস্ট, ২০১৫ (মঙ্গলবার) অপরাহ্নে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ৮৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
তাঁর আদর্শ এবং রেখে যাওয়া মূল্যবোধ আগামী প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। মহান আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করেন।

আরো