জাতিসংঘের আদালতে শুরু রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার বিচার
মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজি)। প্রায় এক দশক পর এই ঐতিহাসিক মামলার আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হচ্ছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) রাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আইসিজিতে সোমবার (১২ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে শুনানি শুরু হবে, যা বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩টা। টানা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে এই শুনানি চলবে।
রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলার তদন্তকারী সংস্থা ‘ইউএন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার’-এর প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান রয়টার্সকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এই বিচার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
২০১৭ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কয়েকটি পুলিশ চৌকি ও সেনা স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। মিয়ানমার সরকার ওই হামলার দায় সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-এর ওপর চাপায়। এর পরপরই ওই বছরের আগস্টে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় ‘নিরাপত্তা অভিযান’ শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।
তবে অভিযানের নামে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, লুটপাট ও গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই সহিংসতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশে পালিয়ে যায়। বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমতে, ওই সময় প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যারা এখনও শরণার্থী হিসেবেই বসবাস করছে।
ঘটনার পর জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধানী দল তদন্ত চালিয়ে তাদের প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনা অভিযানকে ‘গণহত্যামূলক আচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আইসিজিতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করে।
রোহিঙ্গা নিপীড়নের সময় মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন নোবেল বিজয়ী অং সান সুচি। তিনি জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও গাম্বিয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সেগুলোকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বর্তমানে তিনি কারাবন্দি রয়েছেন এবং সামরিক আদালতে দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি।
বর্তমানে মিয়ানমারে সামরিক শাসনের অধীনে নির্বাচন প্রক্রিয়া চললেও জাতিসংঘ, পশ্চিমা দেশ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে অবাধ ও সুষ্ঠু নয় বলে সমালোচনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার এই বিচার শুধু মিয়ানমারের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আইসিজিতে দায়ের করা দক্ষিণ আফ্রিকার গণহত্যা মামলার ক্ষেত্রেও এর আইনি দৃষ্টান্ত প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।