দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া সফল নির্বাচন সম্ভব নয়: সিইসি

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সম্পূর্ণ সংঘাতহীন ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে বসে একটি সমঝোতা ও ফয়সালায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এককভাবে কোনো নির্বাচন সফল করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

সোমবার (১৮ মে) রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) নবনির্বাচিত কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিইসি তার অভিজ্ঞতা, বিগত নির্বাচনের বাস্তবতা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কমিশনের নানা ভাবনার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে অন্য চার নির্বাচন কমিশনার এবং সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সিইসি বলেন, সাংবাদিকরা যেসব আইডিয়া ও পরামর্শ পত্রিকার পাতায় তুলে ধরেন, তা তিনি নিজে নোট করে নির্বাচন কমিশনের কাজে লাগিয়েছেন। গণমাধ্যমের কল্যাণে কোটি কোটি টাকা খরচ না করেই নির্বাচন কমিশন তাদের নীতি ও বার্তা সারা দেশের মানুষের কাছে বিনামূল্যে পৌঁছে দিতে পারছে।

কাজের স্বচ্ছতা ও কঠোর নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সবসময় একটি সৎ ও সঠিক পথের মধ্যে ছিল। অনেক বড় বড় নেতা ফোনে কথা বলতে চাইলেও আমি বলিনি। সবাইকে অফিসে এসে কথা বলার নিয়ম বজায় রেখেছি। আইন-কানুনের প্রতি অঙ্গীকার ও নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকাকেই আমি সবচেয়ে বড় মনে করি। কারণ দিনশেষে সবাইকে সৃষ্টিকর্তার কাছে চূড়ান্ত জবাবদিহি করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইন ছাড়া, একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করাই কমিশনের একমাত্র লক্ষ্য।

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সহযোগিতা প্রসঙ্গে সিইসি দ্বিধাহীনভাবে জানান, সরকার ছাড়া নির্বাচন করা প্রায় অসম্ভব এবং আগের সরকার তাদের পুরোপুরি সহায়তা দিয়েছে। সরকারের প্রধান সে সময় তার উপদেষ্টা পরিষদকে নির্বাচন কমিশনের কাজে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করতে এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সরকার প্রধানের একমাত্র প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন উপহার দেওয়া।

তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সিইসি নিজের গভীর উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করা উচিত যাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো ঝামেলা বা রক্তপাত না হয়। অতীতে এই নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে একই পরিবারে বা গ্রামে গ্রামে মারামারি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত থাকলেও বিভিন্ন দল থেকে অলরেডি মনোনয়নের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কোনো একবারের বিষয় নয়, বরং দেশে সভ্য দেশগুলোর মতো একটি সুন্দর নির্বাচনী সংস্কৃতি চালু করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে শতভাগ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমরা সবার সহযোগিতা চাই। একইসঙ্গে ভোটার এজেন্ট ও সাংবাদিকদের আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

ভোটার তালিকার জটিলতা নিয়ে নিজের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করে সিইসি বলেন, কিছু নারী ভোটার চেহারা না দেখিয়ে বোরকা পরা অবস্থায় ভোটার হওয়ার দাবি জানিয়ে মানববন্ধন করেছেন। তাদের নেতাদেরকে নারী কর্মী দিয়ে ছবি তোলার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা রাজি হননি। এই ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীলতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় বিধায় সাংবাদিকদের এই এরিয়াতে কাজ করে মানুষকে বোঝানোর অনুরোধ জানান তিনি।

নির্বাচন পরিচালনার পেছনের বাস্তবতার কথা তুলে ধরে সিইসি বলেন, যেহেতু এবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে না, তাই আচরণবিধি ও পরিচালনা বিধি পরিবর্তনের কাজ চলছে। জাতিসংঘের ওমেন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেলও বাংলাদেশের এই সুন্দর নির্বাচনের রহস্য জানতে চেয়েছিলেন।

সিইসি উল্লেখ করেন, বিপ্লবের পর দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান যখন ঠিকমতো কাজ করছিল না, তখনো সবার দাবি ছিল একটি সুন্দর নির্বাচন। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মোটিভেট করতে তিনি রমজান মাসে কর্মকর্তাদের হাত তুলিয়ে নিরপেক্ষ কাজের শপথ করিয়েছেন এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় মাজার ও মসজিদে জুমার নামাজে অংশ নিয়ে সাধারণ মানুষকে ভোটকেন্দ্রে আসতে ও নিজেদের ভোটাধিকার রক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে, সেই ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

সিইসি আরএফইডির নতুন কমিটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, নির্বাচন কমিশনের শুধু প্রশংসা করার প্রয়োজন নেই, কোনো ভুল হলে তা যেন সাংবাদিকরা ধরিয়ে দেন যাতে কমিশন তা সংশোধন করতে পারে। আরএফইডি তার বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ধারা অব্যাহত রাখবে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেশের জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক দলগুলোর পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া যাবে প্রত্যাশার কথা জানান তিনি।

আরো