ধানমন্ডি জলসিঁড়ি ও আফতাবনগরেও রয়েছে এনবিআর শহিদুলের সম্পদ

বনশ্রীতে বাড়িসহ আরও একাধিক প্লটের চাঞ্চল্যকর তথ্য

স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক প্রভাবশালী সদস্য শহিদুল ইসলামের হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজে নেমে অনুসন্ধানকারীরা যতই গভীরে যাচ্ছেন, ততই বেরিয়ে আসছে নিত্যনতুন চোখ কপালে ওঠার মতো সব চাঞ্চল্যকর তথ্য। শহিদুলের একজন বিশ্বস্ত আত্মীয়ের সাথে কথা হলে তিনি বলেন আমার যতটুকু জানা শহিদুল ভাইয়ের ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন জায়গায় সম্পদ রয়েছে এবং কিছু ব্যাংকেও রয়েছে টাকা যেগুলো তিনি এখন পর্যন্ত নিতে পারেননি। তবে যে কোন সময় তিনি এই টাকা উত্তোলন করে বিদেশে পাচার করবে। গত ২৫ মে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইট টিজি ৩২২ বিমানে করে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে সপরিবারে ব্যাংককে পাড়ি জমানো এই চতুর কর্মকর্তার স্থাবর সম্পত্তির তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে রাজধানীর আরও কয়েকটি হাইপ্রোফাইল ও ব্যয়বহুল আবাসন প্রকল্প। নতুন অনুসন্ধানে প্রামাণ্যভাবে জানা গেছে, অভিজাত ও সুরক্ষিত জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের ২ নম্বর সেক্টরে শহিদুল ইসলামের নামে ৫ কাঠার একটি অত্যন্ত মূল্যবান আবাসিক প্লট রয়েছে। কেবল আবাসিক প্লটই নয়, একই প্রকল্পের ১৬ নম্বর সেক্টরে তার নামে সাড়ে ৪ কাঠার আরও একটি বিশাল বাণিজ্যিক বা কমার্শিয়াল প্লটের সন্ধান মিলেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য আকাশচুম্বী। এছাড়া রাজধানীর মেরুল বাড্ডা সংলগ্ন জহুরুল ইসলাম সিটি তথা আফতাবনগর আবাসিক এলাকায় শহিদুলের নামে দুটি দামী প্লট এবং রামপুরার বনশ্রী আবাসিক এলাকায় নিজস্ব একটি বহুতল বাড়িসহ আরও তিনটি প্লটের অকাট্য তথ্য অনুসন্ধানকারীদের হাতে এসেছে।
​আপাতত ব্যাংককের একটি আলিশান হোটেলে পরিবার নিয়ে বিলাসী অবসর সময় কাটানোর আড়ালে শহিদুল ইসলাম মূলত এই বিপুল নতুন ও পুরাতন সম্পদগুলো দ্রুত নগদায়ন করার চূড়ান্ত ছক বাস্তবায়ন করছেন। যেহেতু দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ দেশের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখনো তার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো কঠোর আইনি পদক্ষেপ বা ক্রোকের আদেশ জারি করেনি, তাই তিনি এই শৈথিল্যের সুযোগ নিয়ে বেশ সতর্কতার সাথে তার এই রিয়াল এস্টেট সাম্রাজ্য বিক্রির চেষ্টা করছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দিয়ে অর্জিত এই সমস্ত কালো টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ব্যাংককে নিজের কাছে নেওয়ার জন্য তিনি তার দুই ভাই সেলিম ও জাকির এবং চার শ্যালক কাজী মুক্তাদীর ইবনু মিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান ও কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনানের নামে পুরাতন বা পেছনের তারিখ দেখিয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা দেওয়ার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছেন। এই বিশ্বস্ত সহযোগীরাই এখন জলসিঁড়ি, আফতাবনগর ও বনশ্রীর নতুন এই সম্পত্তিগুলোসহ তার পূর্বের বিশাল ল্যান্ড ব্যাংক বিক্রির জন্য দেশের বড় বড় রিয়াল এস্টেট ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সাথে গোপনে দরদাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
​এই আমমোক্তারনামা জালিয়াতি ও হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচারের মহোৎসবে জলসিঁড়ি ও আফতাবনগরের নতুন প্লটগুলোর পাশাপাশি তার পূর্বের দৃশ্যমান সমস্ত সম্পদই বিক্রির তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকের ১৬ নম্বর রোডের ৭৯-৮০ নম্বরের ‘শেল কবিতা’ নামক ২০ ফ্ল্যাটের নিজস্ব বহুতল ভবন, গুলশান ও বনানীর একাধিক ভিআইপি প্লট ও ফ্ল্যাট, দেশের বিভিন্ন নামী কোম্পানিতে তার বেনামী ইনভেস্টমেন্ট, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি-ব্লকের আরও ৬টি প্লট, আই-ব্লকের বাণিজ্যিক ফ্লোর, এন-ব্লকের প্লট এবং জে-ব্লকের ২০ কাঠার একাধিক মূল্যবান বাণিজ্যিক প্লট। এছাড়া রাজউকের পূর্বাচল সংলগ্ন আমেরিকান সিটিতে সন্ধান পাওয়া তার ১০৪ কাঠা মূল্যবান জমি, যার সত্যতা প্রকল্পের সাইট কর্মকর্তা মনির স্বীকার করেছেন এবং যেখানে আরও একশ’র বেশি এনবিআর কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ রয়েছে, তাও এই দালাল চক্রের মাধ্যমে বিক্রির চেষ্টা চলছে। তালিকায় আরও রয়েছে সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের ৩৫ কাঠার রাজকীয় বাংলোবাড়ি ‘সেঁজুতি’ এবং খামার ও গ্যারেজসহ সেখানকার ৩২০ কাঠার পাঁচটি বিশাল বাণিজ্যিক প্লট যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা, বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারের দুটি ফ্ল্যাট, শাহবাগ ও নিউমার্কেটের দোকান, মিরপুরে স্ত্রীর নামে থাকা ৩০ কোটি টাকার ভবন এবং পূর্বাচল, ডুমনি, পিতলগঞ্জ ও গাজীপুরের শত বিঘা জমি। এমনকি বড় ছেলে হাসিন ফারহানের বসুন্ধরার জেসিএক্স টাওয়ারের ভেলোসিটি আইটি ফার্মের কোটি টাকার অফিস, যার পার্টনার তাহির হাসান সাংবাদিকদের ফোন নম্বর ব্ল্যাকলিস্টে রেখেছেন, সেই সম্পদও এই জালিয়াতির আওতাভুক্ত। চিকিৎসার নামে মালয়েশিয়া যাওয়ার মিথ্যা প্রচারণা ছড়িয়ে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে ব্যাংককে আত্মগোপন করা শহিদুলের এই একের পর এক নতুন সম্পদের সন্ধান দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

আরো