দেশে ফিরেই আড়ালে শহিদুল, সম্পদ বিক্রির হিরিক
স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক প্রভাবশালী সদস্য শহিদুল ইসলামের হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও আন্তর্জাতিক পলায়নের নাটকে এবার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ও শ্বাসরুদ্ধকর এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। চিকিৎসার নামে মালয়েশিয়া যাওয়ার ভুয়া গল্প ফেঁদে গত ২৫ মে থাই এয়ারওয়েজের টিজি ৩২২ ফ্লাইটে সপরিবারে ব্যাংককে আত্মগোপন করা এই কর্মকর্তা আর বিদেশে নেই। আমাদের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত এভিয়েশন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, গত ২ জুলাই থাই এয়ারওয়েজেরই অপর একটি নিয়মিত ফ্লাইট টিজি ৩৩৯ বিমানে চেপে তিনি ব্যাংকক থেকে অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। ওইদিন থাইল্যান্ডের সময় রাত ১১টা ৫০ মিনিটে বিমানটি ব্যাংকক থেকে উড্ডয়ন করে এবং গভীর রাতে অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় রাত ১টা ২৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দেশে ফিরে কোনো প্রকার আলোড়ন না তুলে সম্পূর্ণ লোকচক্ষুর আড়ালে এবং অত্যন্ত গোপন কোনো আস্তানায় অবস্থান করছেন শহিদুল সাহেব। মূলত তার এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে এক ভয়ঙ্কর মাস্টারপ্ল্যান। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে দূর দেশে বসে আমমোক্তারনামা দিয়ে এই বিপুল সাম্রাজ্য দ্রুত বিক্রি করা সম্ভব নয়, তাই নিজের সরাসরি তত্ত্বাবধানে অতিঘনিষ্ঠ কিছু দালাল ও অংশীদারদের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করছেন।
অনুসন্ধানী সূত্রগুলো সতর্ক করছে যে, এত বিপুল পরিমাণ টাকা কোনোভাবেই বৈধ উপায়ে বা ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই শহিদুল ইসলাম দেশে থাকা তার শেষ সম্পদটুকু বিক্রি করে সেই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টে পাচার করার মোক্ষম সুযোগ খুঁজছেন। আর এই অর্থ পাচারের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়া মাত্রই তিনি মোটামুটি চিরতরে দেশত্যাগ করবেন, যাতে একবার সীমানা পার হতে পারলে তার জীবনের সমস্ত পাপ ও অপরাধের ফাইল চিরতরে ধামাচাপা পড়ে যায়। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) কোনো কমিশন বা শীর্ষ নীতিনির্ধারক না থাকায় শহিদুলের এই গোপন মিশন আরও সহজ হয়ে উঠেছে। তবে সচেতন মহলের মতে, দেশের এই ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ তথা বিএফআইইউ এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি যদি অবিলম্বে তৎপর হয়, তবে শহিদুল ইসলামের বর্তমান গোপন অবস্থান নিশ্চিত করে তাকে আইনের আওতায় আনা এবং দেশের হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিদেশে পাচার হওয়া ঠেকানো এখনও সম্ভব।
শহিদুলের এই শেষ মুহূর্তের গোপন মিশনের মূল লক্ষ্য হলো জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের ২ নম্বর সেক্টরের ৫ কাঠার আবাসিক প্লট ও ১৬ নম্বর সেক্টরের সাড়ে ৪ কাঠার বাণিজ্যিক প্লট এবং আফতাবনগরের দুটি ও বনশ্রীর বাড়িসহ তিনটি মূল্যবান প্লট দ্রুত নগদ টাকায় রূপান্তর করা। এছাড়া এই জালিয়াতি চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে গুলশান ও বনানীর একাধিক ভিআইপি প্লট ও ফ্ল্যাট, রাজউকের পূর্বাচল সংলগ্ন আমেরিকান সিটিতে থাকা ১০৪ কাঠা জমি, যার সত্যতা প্রকল্পের সাইট কর্মকর্তা মনির স্বীকার করেছেন এবং যেখানে আরও একশ’র বেশি এনবিআর কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ রয়েছে। একই সাথে বিক্রির তালিকায় রয়েছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জি ব্লকের ১৬ নম্বর রোডের ৭৯-৮০ নম্বরের ‘শেল কবিতা’ নামক ২০ ফ্ল্যাটের নিজস্ব বহুতল ভবন, জি-ব্লকের আরও ৬টি প্লট, আই-ব্লকের বাণিজ্যিক ফ্লোর, এন-ব্লকের প্লট এবং জে-ব্লকের ২০ কাঠার একাধিক মূল্যবান বাণিজ্যিক প্লট। পাশাপাশি সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের ৩৫ কাঠার রাজকীয় বাংলোবাড়ি ‘সেঁজুতি’ এবং খামার ও গ্যারেজসহ সেখানকার ৩২০ কাঠার পাঁচটি বিশাল বাণিজ্যিক প্লট যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা, বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারের দুটি ফ্ল্যাট, শাহবাগ ও নিউমার্কেটের দোকান এবং মিরপুরে স্ত্রীর নামে থাকা ৩০ কোটি টাকার ভবন ও চার শ্যালকের নামে কাগজে-কলমে থাকা ২০টি ফ্ল্যাট। এমনকি ছোট ছেলে হাসিন ফারহানের বসুন্ধরার জেসিএক্স টাওয়ারের ভেলোসিটি আইটি ফার্মের কোটি টাকার অফিস, যার পার্টনার তাহির হাসান সাংবাদিকদের ফোন নম্বর ব্ল্যাকলিস্টে রেখেছেন, সেই সম্পদসহ পূর্বাচল, ডুমনি, পিতলগঞ্জ ও গাজীপুরের শত বিঘা জমিও এই হুন্ডি চক্রের মাধ্যমে দ্রুত পাচারের ছক চূড়ান্ত করা হয়েছে। মাঝরাতে বিমানে এসে দেশের মাটিতে লুকিয়ে থাকা শহিদুলের এই শেষ চাল এখন বিএফআইইউ ও সিআইডির টেবিলে এক বড় পরীক্ষা।
পরবর্তী নিউজে আমরা জানাবো শহিদুলের অবৈধ টাকা দিয়ে জমজ দুই ছেলের বিলাসবহুল জীবন যাপন এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড়সহ কানাডায় আয়েশি জীবন।