চব্বিশের ১৪ জুলাই: কোটাবিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক রূপায়ন

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

১৪ জুলাই থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। সরকার, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, সহিংসতা, প্রাণহানি ও ব্যাপক অস্থিরতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবির গণ্ডি অতিক্রম করে বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়, যা পরবর্তীকালে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৪ জুলাইয়ের পুর্বের দিনগুলো মূলতঃ কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসাবেই পরিচিত ছিল। দাবী আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্ততি গ্রহণ করে এক দফার আন্দোলনে রূপান্তর করে ফ্যাসিবাদকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। চব্বিশের ৮ জুলাই চার দিনের সফরে চীন গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট হাসিনা। ১১ জুলাই ফেরার কথা থাকলেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে ১০ জুলাই রাতে তিনি দেশে ফিরে আসেন। ১৪ জুলাই বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতিকে স্মারকলিপি পেশ করতে গিয়ে বাঁধার শিক্ষার্থীরা সম্মুখীন হয়। সেদিন ৩টায় গণভবনে ছিল শেখ হাসিনার চীন সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন। কর্মসূচি শেষ করে শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে দেখতে পান শেখ হাসিনা তাদের ইঙ্গিত করে বলছেন- ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিরা কোটা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিরা কোটা পাবে? তা তো আমরা দিতে পারি না।’ সাংবাদিক ফারজানা রূপার প্রশ্নের জবাবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার বাঁক ঘুরানো উত্তরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া- পরিণামে সদলবলে পলায়ন বললে বেশি বলা হবেনা। মূলতঃ ফ্যাসিস্ট সরকার অভূতপূর্ব পলায়নের পূর্বে কোটাবিরোধী আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপায়নের কাজটিও নিজেরাই করেছে এবং বিচারবিভাগকে ব্যবহার করে নিজেদের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে।
জুলাইর ৬ তারিখ থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও সুসংগঠিত ও বিস্তৃত হতে শুরু করে। শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচি পালিত হয়। শাহবাগসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন শুধুমাত্র কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশব্যাপী সমন্বিত ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়। এই দিনের ধারাবাহিক কর্মসূচি পরবর্তী সপ্তাহে আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তার এবং আরও বৃহত্তর গণআন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এদিনের আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন; “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন”-এর ব্যানারে একযোগে কর্মসূচি পালন এবং আন্দোলনকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ; শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহবান; বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একটি অংশ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন; বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও গণসংযোগ কর্মসূচি পালন। কয়েকটি স্থানে প্রশাসনের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের ছবি, ভিডিও ও বক্তব্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ৭ জুলাই কোটাবিরোধী আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও সুসংগঠিত রূপ লাভ করে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে একযোগে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীরা আদালতের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। ৮ জুলাই কোটাবিরোধী আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও গতিশীল রূপ লাভ করে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষার্থীরা একযোগে কর্মসূচি পালন করেন এবং আন্দোলন রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও ছড়িয়ে পড়ে। কোটাবিরোধী আন্দোলন স্পষ্টভাবে একটি দেশব্যাপী সমন্বিত ছাত্র আন্দোলনে পরিণত হতে শুরু করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলার মধ্যে সমন্বয় জোরদার হয়, জনসমর্থন বৃদ্ধি পায় এবং আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়। সমন্বয়কারীরা দেশব্যাপী একযোগে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের একটি অংশ আন্দোলনের দাবির প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়; তবে অধিকাংশ স্থানে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়। ৯ জুলাই ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ১০ জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো আরও সুসংহত করা হয়, সমন্বয়কারীদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পায় এবং জাতীয় পর্যায়ে জনমত আরও বেগবান হতে থাকে। “কমপ্লিট শাটডাউন” ও দেশব্যাপী সর্বাত্মক অবরোধের ডাক দেন শিক্ষার্থীরা। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় এক মাসের জন্য স্থগিত করেন। ১১ জুলাই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি পালন করা হয় ও দেশের বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১২ জুলাই রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে বড় আকারের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সমর্থন বৃদ্ধি পায়। আন্দোলনের দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তীব্র হয়। ১৩ জুলাই ২০২৪ তারিখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে বৃহত্তর কর্মসূচির ঘোষণা দেন। আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ জানান যে-সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও সংগঠিত করা হবে। ঘোষিত কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একই প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করা এবং শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের চাপ বৃদ্ধি করা। সমন্বয়করা শিক্ষার্থীদের অহিংস ও শৃঙ্খলাপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং পরদিন (১৪ জুলাই) থেকে দেশব্যাপী আরও বৃহত্তর কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা দেন।
১৩ জুলাই আন্দোলনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও পরবর্তী ধাপের সূচনার দিন হিসাবে চিহ্নিত। এদিনের কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন কেবল কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশব্যাপী একটি সমন্বিত ছাত্র আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে, যা পরবর্তী দিনের ঘটনাবলীর ভিত্তি তৈরি করে। কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনের সাংগঠনিক বিস্তার লাভ করে- শিক্ষক, অভিভাবক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের মাঝে ক্রমবর্ধমান সমর্থন বৃদ্ধি পেতে থাকে। নেতৃত্বের সমন্বয় শক্তিশালী হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায় ও দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া অধিকতর তীব্র ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি হয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের প্রথম দিনে কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা ১৩ দিন শিক্ষার্থীদেরই ছিল। ১৪ জুলাই বিকেল ৩টায় গণভবনে শেখ হাসিনার চীন সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ইঙ্গিত করে বলেন- ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিরা কোটা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিরা কোটা পাবে? তা তো আমরা দিতে পারি না।’ ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ আখ্যা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ১৪ জুলাই রাতে আবাসিক হল ছেড়ে নেমে আসেন রাজপথে। ছাত্রীরাও হলের গেট ভেঙে বেরিয়ে আসেন। মধ্যরাতের নীরবতা ভেঙে শিক্ষার্থীদের তপ্ত স্লোগান আন্দোলনকে নিয়ে যায় অভ্যুত্থানের দিকে। “তুমি কে আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার! ‘চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ এসব শ্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়; জগন্নাথ, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, শাহজালাল, ইসলামী, কুমিল্লা, বেগম রোকেয়া, বরিশাল, যশোরসহ অন্তত ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী সেই রাতে ছাত্রলীগের দমনের ভয়কে উপেক্ষা করে রাজপথে নামেন। সামাজিক মাধ্যমে সেই রাতেই প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষ শিক্ষার্থীদের দাবিতে সমর্থন জানাতে শুরু করে। ছাত্র সমাজের সেদিনের সাহসী ভূমিকার কারণেই মূলতঃ রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন দিকে মোড় নিয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহর মতে- “১৪ জুলাই রাতে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসা ছিল ক্ষোভের বিস্ফোরণ। শেখ হাসিনার ক্ষমতার দম্ভে অপমানিত শিক্ষার্থীরা আর চুপ থাকতে পারছিল না। ছাত্রলীগের ভয় ভেঙে সেই রাতের নীরবতা ভাঙা ছিল অভ্যুত্থানের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।” (চলবে)

*রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জুলাই অভ্যূত্থানের সক্রিয় কর্মী

আরো