ছাত্রজনতার সংঘবদ্ধতা ও রাজনীতির নীরব সমীকরণ
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই-২০২৪ একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। পরবর্তীকালে ৩৬ দিনব্যাপী দেশব্যাপী যে গণআন্দোলন বিস্তৃত হয়, জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এর প্রাথমিক সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। ৪ ও ৫ জুলাই কেবল দুটি ক্যালেন্ডারের দিন ছিলনা, বরং দীর্ঘদিন ধরে জাতির স্কন্ধে চেপে বসা ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের খড়গ অপসারণ ও ঐতিহাসিক পট পরিবর্তন, সফলতা ও সম্ভাবনার প্রস্তুতি পর্ব। আন্দোলন শুরুর সময়ে ছাত্রসমাজের সাংগঠনিক সক্ষমতা যেমন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তেমনি দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান ও কৌশল নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছিল। বিগত ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গুম, খুন, ভোটাধিকার হরণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করা হয়েছিল; বিদেশী প্রভুদের নির্দেশনা অনুযায়ী শুধুমাত্র একটি পরিবারের একাধিপত্য কায়েমে বিরোধীদের উপর দমন ও নির্যাতন চালিয়েছিল; জনগণের উপর অত্যাচারের স্টীম রোলার চালিয়ে তারা যখন প্রায় শতভাগ সফলতার দ্বারপ্রান্তে তখনি মহান আল্লাহর সাহায্য এসেছিল; পরবর্তীতে প্রকাশিত সরকারি নথি, গবেষণা, সাক্ষাৎকার, আদালতের দলিল এবং স্বাধীন অনুসন্ধান সেই দিনগুলোর ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ইতিহাস আরও সুস্পষ্ট ও পরিপূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব হয়েছে। ইতিহাসের বিচারে জুলাই আন্দোলন শুধু একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনা নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের সাংগঠনিক দক্ষতা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং শান্তিপূর্ণ গণসংগঠনের রুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ছাত্রসমাজের উদ্ভাবনী কর্মসূচি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমন্বিত ব্যবহার যুগের পর যুগ ধরে ভবিষ্যতের নাগরিক আন্দোলন নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
বিশেষ করে জুলাইয়ের ৪ ও ৫ তারিখ এমন গতি পরিবর্তনকারী দুটি দিন ছিল, যখন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অভূতপূর্ব সমন্বয়, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং যৌথ কর্মসূচির ভিত্তি দৃশ্যমান হতে শুরু করে। বিকেন্দ্রীভূত সমন্বয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং জেলার শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে কর্মসূচি গ্রহণপূর্বক জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করেন। আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। শিক্ষার্থীদের এই সমন্বিত আন্দোলন ক্রমান্বয়ে বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ লাভ করেছিল। ছাত্রসমাজের সৃজনশীল, সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক কর্মসূচি ও পারষ্পরিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকরী ব্যবহার ঘটেছিল যখন আমরা ভাবতে শুরু করেছিলাম যে আমাদের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষা ও গবেষণা বাদ দিয়ে শুধু তথ্যপ্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে ব্যস্ত ও এসব ব্যবহারে অযথা তারা সময় নষ্ট করছে। আমরা বুঝতে পারিনি- আমাদের মেধাবী তরুণ সমাজ দেশ মাতৃকার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতেপ্রস্তুতি গ্রহণ ও কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। প্রাণজ শিক্ষার্থীরা প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে গিয়ে নতুন ধরনের প্রতিবাদের ভাষাও সৃষ্টি করেছিল। বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, গণসমাবেশ, প্রতিবাদী স্লোগান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, বাংলা ব্লকেড, কমপ্লিট শাটডাউন, মশাল মিছিল, নীরব কর্মসূচি, প্রতীকী প্রতিবাদ ও বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ অবস্থান—এসব ক্যারিশমাটিক কর্মসূচি আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলায় চূড়ান্ত লড়াইয়ে এই আন্দোলন সফল হয়েছিল। তাঁদের কর্মসূচিগুলো ছিল পরিকল্পিত, অংশগ্রহণমূলক ও দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৪ জুলাই, ২০২৪ (সোমবার) দেশব্যাপী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, গণসংযোগ এবং শ্রেণিকক্ষে সচেতনতামূলক প্রচারণা পরিচালনা করেন। তারা আন্দোলনের দাবিসমূহ শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে ক্যাম্পাসজুড়ে লিফলেট বিতরণ, পোস্টার প্রদর্শন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত প্রচারণা অব্যাহত রাখে। কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় সভা ও পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণে আলোচনা হয়।
৫ জুলাই ২০২৪(মঙ্গলাবার) আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সমন্বয়কারীরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করে কর্মসূচির সময়সূচি ও কৌশল নির্ধারণ করেন। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা, উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা এবং দাবির পক্ষে গণসমর্থন বৃদ্ধি করার আহ্বান জানায়।
এই দুই দিনে আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—
• দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি।
• কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সমন্বয়কারীদের মাধ্যমে কর্মসূচির একযোগে বাস্তবায়ন।
• সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত তথ্য ও নির্দেশনা প্রচার।
• শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনমত গঠন।
• পরবর্তী বৃহত্তর কর্মসূচির জন্য সাংগঠনিক প্রস্তুতি গ্রহণ।
আন্দোলনের সূচনালগ্নে প্রধান দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু খুব দ্রুতই এটি কেবল একটি নীতিগত দাবি নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের বিস্তৃত আলোচনায় রূপ নিতে থাকে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।
৪ ও ৫ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—আন্দোলনকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাখার সচেতন চেষ্টা। নেতৃত্ব বারবার ঘোষণা করে যে আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং এটি শিক্ষার্থীদের অধিকারভিত্তিক একটি নাগরিক আন্দোলন। ফলে এই কৌশলগত অবস্থান সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহানুভূতি আন্দোলনের প্রতি বৃদ্ধি পায়।
তবে একই সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনও নীরব ছিলনা। সরকারবিরোধী বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল এবং প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের দাবি ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করেছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিরোধী দলগুলোর এই অবস্থান আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে আরেকটি মত হলো, রাজনৈতিক দলসমূহ আন্দোলনের গতিপ্রিকৃতি ও অগ্রগতিকে নিজেদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করলেও, আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কর্মসূচি মূলত শিক্ষার্থীদের হাতেই ছিল। কিছু পর্যবেক্ষক আরও দাবি করেছেন যে, সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এক ধরনের নীরব সমঝোতা বা কৌশলগত বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল, ছাত্র আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্য বিরূপ অবস্থান গ্রহণ না করে বরং আন্দোলন ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন মাধ্যমে পরামর্শ ও নির্দেশণা অব্যাহত রেখেছিল।
জুলাইয়ের সেই দিনগুলো প্রমাণ করেছে যে সংগঠিত ছাত্রসমাজ, কার্যকর নেতৃত্ব, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ এবং জনসম্পৃক্ততা— কিভাবে একটি আন্দোলনের বিস্তার ও প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। কর্মসূচি ঘোষণা, তথ্য আদান-প্রদান, ভিডিও প্রচার এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তাৎক্ষণিক সমন্বয় আন্দোলনের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রচলিত সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে ডিজিটাল যোগাযোগ যে একটি গণআন্দোলনের গতি ও বিস্তারকে কত দ্রুত প্রভাবিত করতে পারে, জুলাইয়ের ঘটনাবলি তার একটি বাস্তব উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলনের গতিপথে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। Facebook, Messenger, WhatsApp, Telegram, Instagram, X/Twitter ইত্যাদি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে কর্মসূচি, নির্দেশনা, ছবি, ভিডিও এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে কোনো ঘটনার তথ্য প্রচারে প্রচলিত গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে এসেছিল। জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, বর্তমান সময়ে একটি গণআন্দোলনের শক্তি শুধু মাঠের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; বরং ডিজিটাল যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং দ্রুত সমন্বয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখেছি- কিভাবে মাঠের কর্মসূচি এবং অনলাইন প্রচারণা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে। দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েও ফ্যাসিস্ট সরকার আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে পারেনি।
পরবর্তী সময়ে আন্দোলন যে বিস্তৃত গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল, এর পেছনে ছাত্রসমাজের আত্মত্যাগ, সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও নৃশংসতা, রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়ক অবস্থান, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, মানবাধিকার কর্মী, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব এই ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল। ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের স্বার্থে এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে স্বীকার করা জরুরি। মনে রাখতে হবে- গণআন্দোলনের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন একক কোনো শক্তির দ্বারা সংঘটিত হয় না। শিক্ষার্থী, সাধারণ জনগণ, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রযন্ত্র, নাগরিক সমাজ ও সময়ের বাস্তবতা—সব মিলিয়েই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারিত হয়। জুলাই ২০২৪-এর প্রথম সপ্তাহও তার ব্যতিক্রম ছিলনা। (চলবে)
*রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জুলাই আন্দোলন-২০২৪ এ সক্রিয় কর্মী।