পলাশীর বিপর্যয়: বিশ্বাসঘাতকতা, উপনিবেশবাদ ও ইতিহাসের শিক্ষা

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে সংঘটিত ঘটনাকে কেবল একটি যুদ্ধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল বাংলার স্বাধীনতা হারানোর সূচনা এবং উপমহাদেশে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মোড় ঘোরানো অধ্যায়। দার্শনিক জর্জ সান্টায়ানার ভাষায়, “যারা অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না, তারা সেই অতীত পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বহন করে।” পলাশীর ইতিহাস সেই শিক্ষারই এক নির্মম স্মারক।

পলাশী: যুদ্ধ নয়, ষড়যন্ত্রের পরিণতি
ঐতিহাসিকদের মতে, পলাশীর যুদ্ধ ছিল মূলত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার ফল। নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ ও মীরজাফরসহ একদল স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে গোপন সমঝোতা করে। ফলস্বরূপ, যুদ্ধক্ষেত্রে নবাবের বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও বিজয়ী হয় রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনী।

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে লিখেছেন, “ক্লাইভের বিজয় ছিল প্রতারণা ও ছলচাতুরীর বিজয়।”

পলাশীর পর বাংলার অর্থনৈতিক লুণ্ঠন
পলাশীর পর মীরজাফরকে নবাব করা হলেও প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। ইংরেজ কর্মকর্তা ও তাদের দেশীয় সহযোগীরা বিপুল অর্থ, জমি ও উপঢৌকন আদায় করে। রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে এবং বাংলার অর্থনীতি দ্রুত দুর্বল হতে শুরু করে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৬ সালের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ দুর্নীতি ও উৎকোচের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছিল। রবার্ট ক্লাইভ নিজেও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বাংলায় অর্জিত বিপুল সম্পদের কথা স্বীকার করেছিলেন।

দুর্নীতি ও ‘বাবু সংস্কৃতি’র উত্থান
পলাশী-পরবর্তী সময়ে ইংরেজ শাসনের ছত্রচ্ছায়ায় এক নতুন ধনী শ্রেণির উত্থান ঘটে, যাদের অনেকে ইংরেজ প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে কাজ করত। এদের মধ্য থেকেই গড়ে ওঠে তথাকথিত ‘বাবু সংস্কৃতি’। অন্যদিকে কৃষক, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ ক্রমশ দারিদ্র্য ও বঞ্চনার শিকার হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন যে, এই শ্রেণির অনেকেই ইংরেজদের সহযোগিতার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিল, যখন বাংলার সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল।

দুর্ভিক্ষ ও জনদুর্ভোগ
১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি রাজস্ব আদায়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করে। কৃষকদের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি পায়, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং খাদ্য সংকট তীব্রতর হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বাংলার বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রাণ হারায়।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি কোম্পানির শোষণমূলক অর্থনৈতিক নীতি এই দুর্ভিক্ষকে ভয়াবহ রূপ দেয়। বাংলার জনজীবন দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

ইতিহাসের শিক্ষা
পলাশীর ঘটনা আমাদের শেখায় যে, জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিস্বার্থকে স্থান দিলে রাষ্ট্র ও জাতি চরম মূল্য দিতে বাধ্য হয়। অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, দুর্নীতি, ক্ষমতার লোভ এবং বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরতা একটি জাতির স্বাধীনতাকে বিপন্ন করতে পারে।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হলেও তাঁর প্রতিরোধের ইতিহাস বাঙালির স্বাধীনচেতা মননের অংশ হয়ে আছে। অন্যদিকে বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নাম ইতিহাসে নিন্দার সঙ্গেই স্মরণ করা হয়।

পলাশীর বিপর্যয়ের ২৬৯ বছর পরও এর শিক্ষা প্রাসঙ্গিক। জাতীয় ঐক্য, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক গঠন ছাড়া স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টেকসই করা সম্ভব নয়। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সতর্কবাণী আজও সমানভাবে প্রযোজ্য—
“দুর্গমগিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার,
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার।”
লেখক: গবেষক ও সমাজকর্মী

আরো