হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থা’ চব্বিশের জন আকাঙ্খার পরিপন্থী

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাঠামো ও শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজেদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ প্রকাশ করেছে- ফ্যাসিবাদকে চিরতরে বিলোপের স্বপ্ন দেখেছে। এই রক্তাক্ত আন্দোলনে সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও প্রশ্ন থেকে গেছে—শুধু সরকার পরিবর্তন হলেই কি রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিশ্চিত হয়? অভিজ্ঞমহলের দৃষ্টিতে, এখানেই বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। জুলাইয়ের আন্দোলনে যারা রাস্তায় নেমেছিল, তাদের প্রত্যাশা ছিল কেবল একজন শাসকের পতন নয়; তারা চেয়েছিল একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, কার্যকর গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং নাগরিক মর্যাদা। তাই আন্দোলনের রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে যদি পুরোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অক্ষুণ্ন রাখা হয়, তাহলে সেটি হবে জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা। বাংলাদেশের সুবর্নজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালে মোদিবিরোধী আন্দোলন থেকে চব্বিশের জুলাই অভ্যূত্থানে আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশ, তবে আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা ছিল আরও বিস্তৃত।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ যে অভূতপূর্ব গণআন্দোলনের সাক্ষী হয়েছিল, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিণত হয় রাষ্ট্রের প্রচলিত রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যাপক জনঅসন্তোষের বহিঃপ্রকাশে। শিশু, নারী, পুরুষ, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হন। রাজপথে প্রাণ হারানো অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ আন্দোলনকে একটি গভীর নৈতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য প্রদান করেছিল। এই আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন বীর শহীদ আবু সাঈদ ও মুগ্ধসহ বহু তরুণ, যাঁদের মৃত্যু মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। তাঁদের আত্মত্যাগ শুধু একটি সরকারের পতনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিল না; বরং এর মধ্য দিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশাও প্রকাশ পেয়েছিল। ফলে গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল—শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারও ঘটবে। ইতিহাসে দেখা যায়, কোনো গণআন্দোলনের পর রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনকে চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে আন্দোলনের অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। একটি সরকারের পতন একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন; কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও জনগণের প্রত্যাশা ছিল আরও গভীর। তাঁরা চেয়েছিলেন এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমবে, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে, নির্বাচনী ব্যবস্থায় আস্থা ফিরবে, বিচারব্যবস্থা কার্যকর ও নিরপেক্ষ হবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসণপূর্বক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক ঐকমত্য, দূরদর্শিতা এবং সর্বোপরি সদিচ্ছা। বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক স্বার্থকে জাতীয় সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনের ওপরে স্থান দেয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।


রাষ্ট্র সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তিকে দুর্বল করা নয়; বরং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে কোনো দল বা ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে। সংস্কারবিহীন কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে গণতন্ত্রের কাঠামো হয়তো পুণপ্রতিষ্ঠিত হবে, কিন্তু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও জবাবদিহির ভিত্তি শক্তিশালী নাও হতে পারে।
যার জন্য প্রয়োজন—
• নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা;
• বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা;
• আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করা;
• দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা;
• রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমানো;
• ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা;
• গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা;
• নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকারের সুরক্ষা জোরদার করা;
• রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
গণ অভ্যূত্থান পরবর্তী সময়ে বিশেষ তিনটি ক্ষেত্র- আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগের কোন সংস্কার হয়নি ও দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি। আমরা দেখেছি ফ্যাসিবাদের উত্থানকালে আমলাতন্ত্রের নিঃশঙ্ক সমর্থন ও আত্মসমর্পণ, ফ্যাসিস্ট সরকারের একাধিপত্য কায়েমে আমলারা নীতিহীন তৎপরতা প্রদর্শণ করেছেন। তারা বিনা ভোট বা নিশি ভোটের নির্বাচনকে বৈধতাসহ বিরোধী মত ও পথ দমনে সরকারের সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছেন। নোবেল লরেট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেসব কারণে কাজ করতে পারেননি এর অন্যতম কারণ ফ্যাসিস্টের রেখে যাওয়া সেট আপের আমলাতন্ত্র- প্রতি পদে তারা বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলেও তারা সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন, খোলস পাল্টে সেই পুরানো পথেই হাঁটছেন। বিএনপি সরকারের সমলোচিত কর্পোরেশন, পরিষদ ও অধিদপ্তরসমূহে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে আমলাতন্ত্রের সাথে দলীয় সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায়না। ১৯৯৬ সালে মখা আলমগীরের নেতৃত্বে আমলাতন্ত্র সৃষ্ট ‘জনতার মঞ্চ’ ও আমলাদের অপতৎপরতার ইতিহাস বিবেচনায় নিতে হবে। ২০০৬ সালের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব সি. এম. শফি সামী ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি ও আরেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল ‘ফ্লাগ’ খুলে আওয়ামীলীগনেত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করে ১/১১ অনির্বাচিত সরকারের ক্ষমতায় আনার ঘটনায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই সময়গুলোর ইতিহাস এখনো আমাদের চোখের সামনে জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। মূলতঃ বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের মূল কাঠামো ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে বড় ধরনের দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন হয়নি। দলীয় আনুগত্য, পদায়ন ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব, জবাবদিহির ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের মতো পুরোনো সমস্যাগুলো অনেকাংশেই বহাল থাকার অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিগত ৫০ বছরে রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্রে কাঙ্ক্ষিত কোন পরিবর্তন আসেনি।
গণমাধ্যমে মালিকানা কাঠামো, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবমুক্ত সংবাদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মৌলিক সংস্কারের উদ্যোগও যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়া নয়; বরং করপোরেট, রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত চাপ থেকেও মুক্ত থাকা জরুরি। কর্পোরেট হাউজগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন গণমাধ্যমগুলোর বিষয়ে সরকারের ভাবতে হবে- এখন যদিও পেশাগত কারণে সরকার বন্দনায় লিপ্, যেকোন মূহুর্তে এসব মিডিয়া বোল পাল্টে একযোগে সরকারবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ন হতে পারে। ২০০৬ সালের ১/১১ এর দৃশ্যপটে গণমাধ্যমের ভূমিকা জনগণ ভুলে যায়নি। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যম ১/১১-পূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন একটি জনমত তৈরি করেছিল, যেখানে প্রচলিত দলীয় রাজনীতির প্রতি অনাস্থা এবং ‘রাজনীতিবিদদের বাইরে’ একটি নিরপেক্ষ বা সংস্কারমুখী সরকারের আকাঙ্ক্ষা জোরালো হয়। যার ফলে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের একটি অংশ ১/১১ এর বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট; রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাত, নির্বাচন নিয়ে অনাস্থা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ও সামরিক নেতৃত্বের হস্তক্ষেপকে যৌক্তিক হিসাবে জনমনে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট ছিল। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) জানিয়েছিল, জরুরি অবস্থার অধীনে লিখিত ও মৌখিক নির্দেশনার কারণে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছিল। ১/১১-পূর্ব সময়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ১/১১-পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম নিজেই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছিল।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (Supreme Judicial Council) পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বতন্ত্র বিচারিক সচিবালয় (Independent Judicial Secretariat) প্রতিষ্ঠা ছিল বিচার বিভাগ সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। কারণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল সংবিধান বা আইনে ঘোষিত একটি নীতি নয়; এর বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করে বিচারকদের নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও বাজেটের ওপর বিচার বিভাগের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার ওপর।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কার্যকর ভূমিকা বিচারকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র বিচারিক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে আনার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একদিকে বিচারকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব, অন্যদিকে বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও জবাবদিহির জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়।
তবে বিচার বিভাগ সংস্কার কেবল এই দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক ব্যবস্থা, বিচারিক জবাবদিহি, মামলাজট নিরসন, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো, নিম্ন আদালতের স্বাধীনতা এবং বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও সাশ্রয়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বিচার বিভাগ যদি নির্বাহী ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বাস্তবে পুরোপুরি মুক্ত না হয়, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা দুরূহ হয়ে পড়ে। একইভাবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নামে যদি জবাবদিহির ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়, তাতেও জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা, যেখানে বিচার বিভাগ হবে স্বাধীন কিন্তু জবাবদিহিমূলক, ক্ষমতাবান কিন্তু সংবিধান ও আইনের অধীন এবং প্রশাসনিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত কিন্তু জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
অতএব, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের বৃহত্তর লক্ষ্য যদি সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক ও নির্বাহী প্রভাবমুক্ত করার পাশাপাশি এর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং জনগণের কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সুদূরপরাহতই থেকে যাবে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারত—ব্যক্তির পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য ছিল। চব্বিশের আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের মূল্য শুধু স্মরণসভা, স্মৃতিস্তম্ভ বা রাজনৈতিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকার বিপরীতে তাঁদের আত্মত্যাগের প্রকৃত সম্মান হতে পারত এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে নাগরিককে ন্যায়বিচারের জন্য রাজপথে প্রাণ দিতে হবে না; যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হবে; যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং কোনো সরকারই নিজেকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে মনে করবে না। আবু সাঈদ ও মুগ্ধদের আত্মত্যাগ তাই একটি প্রতীকী প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—তাঁরা যে পরিবর্তনের স্বপ্নে জীবন দিয়েছেন, সেই পরিবর্তন কি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল, নাকি রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রের পরিবর্তন? একদিকে রয়েছে পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি—যেখানে ব্যক্তি বদলাবে, কিন্তু ব্যবস্থা বদলাবে না। অন্যদিকে রয়েছে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সম্ভাবনা—যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে জনগণের অধিকার রক্ষা করবে, বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে, প্রশাসন পেশাদার হবে এবং ক্ষমতার পরিবর্তন হবে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস দেখায়, একটি স্বৈরতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতন ঘটানো যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন হলো সেই ব্যবস্থার পুনরুত্থানের পথ বন্ধ করা। পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন যদি অক্ষত থাকে, তাহলে নতুন নামে পুরোনো ব্যবস্থা ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যায়। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হবে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তির পরিবর্তন ঘটবে কিন্তু ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলাবে না; সরকার বদলাবে কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতোই রাজনৈতিক প্রভাবাধীন থাকবে; নির্বাচনের কথা বলা হবে কিন্তু জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে না; সংবিধানের কথা বলা হবে কিন্তু সংবিধানের মৌলিক চেতনা উপেক্ষিত হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিকেই অনেকে ‘হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করছেন—অর্থাৎ ব্যক্তি শেখ হাসিনা ক্ষমতায় নেই, কিন্তু তাঁর আমলের রাজনৈতিক কাঠামো, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো বহাল রয়েছে।
ইতোমধ্যে ফ্যাসিস্ট জমানার রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন চুপ্পু দেরীতে হলেও পদত্যাগ করেছেন এবং শেখ হাসিনা প্রত্যাবর্তণের ঘোষণা দিয়েছেন। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা চলছে, সেটিকে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার ভবিষ্যৎ জড়িত রয়েছে। তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে যে কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগকে তাই জনগণের আকাঙ্ক্ষা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আলোকে বিচার করতে হবে। ‘হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থা’ যদি সত্যিই কোনো বাস্তব রাজনৈতিক প্রবণতা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি দলের জন্য নয়, সমগ্র জাতির জন্য বিপজ্জনক। কারণ, ব্যক্তি পরিবর্তন করে ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনগণের আকাঙ্ক্ষাকেই পরাজিত করে।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক রয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের তুলনায় ভারতের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগের পেছনে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যু রয়েছে। অন্যদিকে সরকারের সমর্থকদের বক্তব্য ছিল, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ও ভারতকে দুটি পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং এমন এক সম্পর্কের কাঠামোয় দেখেছেন যেখানে ভারতের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য খুব বেশি নেই—উভয়েরই প্রধান লক্ষ্য হলো নিজেদের ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ নিশ্চিত করা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে অকার্যকর বা দুর্বল করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের পথ তৈরি করে। ক্ষুদ্র ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো এ ধরনের চাপের মুখে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। কারণ, তাদের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সক্ষমতা অনেক সময় বৃহৎ শক্তির তুলনায় সীমিত। পাশাপাশি কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি তাবেদারী ব্যবস্থায় পতিত হলে সেই রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে কার্যকর জবাবদিহি থাকে না, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, জনবহুল ও তুলনামূলকভাবে ছোট একটি রাষ্ট্র এ ধরণেরর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বাইরে নয়। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি বিদেশি শক্তির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে। বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করতে চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই প্রভাব মোকাবিলা করে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে, নাকি ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে আমলাতন্ত্রের কাছে নতিস্বীকার করবে? জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি সত্যিই নতুন পথে এগোচ্ছে, নাকি পুরোনো কাঠামো নতুন মুখ ও নতুন ভাষায় টিকে থাকছে?
সম্প্রতি মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু পদত্যাগ করায় এই বিতর্ক জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিতর্কের মূল জায়গা হলো—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের পুরোনো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, নাকি গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বন্দোবস্ত তৈরি করা—কোনটি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।” ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে চুপ্পুকে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল রাখায় ফ্যাসিস্ট বিরোধী মঞ্চ তার উপর ক্ষুদ্ধ ছিল। তাঁর রাজনৈতিক অতীত, শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং জুলাই-পরবর্তী সময়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ কিছু রাজনৈতিক শক্তি তাঁর পদত্যাগ, গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি—কোনো পদ থেকে পদত্যাগ করলেই অতীতের সম্ভাব্য দায় থেকে কেউ মুক্তি পেতে পারেন না; অভিযোগ থাকলে তার বিচার আইন অনুযায়ী হতে হবে। ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা’—এই যুক্তি দিয়ে কোনো ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন পদে রাখা হলে তার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে সেই প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই। কারণ, একটি বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজানোর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—পুরোনো অন্যায় দূর করতে গিয়ে নতুন অন্যায়ের জন্ম না দেওয়া।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো বিদেশি শক্তি বাংলাদেশের বন্ধু বা শত্রু—এই সরল দ্বৈততার বাইরে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা ও সার্বভৌম মর্যাদার ভিত্তিতে। কোনো বৃহৎ শক্তির ক্রীড়নক হওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি অন্ধ বৈরিতাও জাতীয় স্বার্থের জন্য কল্যাণকর নয়। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতির পরিবর্তন। শুধু নতুন নেতৃত্ব নয়, প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক মানসিকতা। শুধু নির্বাচনের আয়োজন নয়, প্রয়োজন এমন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ, যেখানে নির্বাচন হবে জনগণের ক্ষমতা প্রয়োগের প্রকৃত মাধ্যম।
বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে; রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি কিংবা আমলা—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন না। জনগণের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের দয়া নয়—এগুলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
সুতরাং, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের একটি প্রকৃত সংস্কার নিশ্চিত করা। শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, দরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন; শুধু নতুন মুখ নয়, দরকার নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি; শুধু পুরোনো ব্যবস্থার সমালোচনা নয়, দরকার তার বিকল্প নির্মাণ।
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি কেবল শাসকের পরিবর্তন চাই, নাকি রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিবর্তন চাই?
ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো দেশি-বিদেশি শক্তি নয়, জনগণের ইচ্ছাই হবে রাষ্ট্রক্ষমতার চূড়ান্ত ভিত্তি। হাসিনাবিহীন হাসিনা ব্যবস্থা দেশ ও জাতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সেটা সময়ই বদলে দিবে।

আরো