বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

ভূমিকা: ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই নব্য স্বাধীন দেশ পরিচালনায় নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের স্থলে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রক্ষীবাহিনীর নির্মম অত্যাচার ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর চরম নির্যাতন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা- লুটপাট-সীমাহীন দুর্নীতির ফলে অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ, এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে দেশের বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়ে। এছাড়া ভারতের আজ্ঞাবহ পররাষ্ট্রনীতি ও দেশবিরোধী আওয়ামী রাজনীতির দেওলিয়াত্বের কারণে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ধারাবাহিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে। পরবর্তীতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
জিয়াউর রহমানের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশ: জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম ভিত্তি ছিল “মুসলিম জাতিসত্ত্বা” ও “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে আপামর ইসলামপ্রিয় মানুষের আকাঙ্খা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে সংবিধানে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে “বাংলাদেশী” জাতীয় পরিচয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের স্থলে মহান আল্লাহর প্রতি “পরম আস্থা ও বিশ্বাস”-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। একই সময়ে দেশের অর্থনৈথিক সমৃদ্ধির পথে জিয়াউর রহমান তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচি জাতির সামনে পেশ করেন। রাজনৈতিক ও আদর্শিক এই প্রক্রিয়াই পরবর্তীতে একটি নতুন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল গঠনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) থেকে বিএনপি
শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী ধারার নেতা-কর্মীদের নিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নিয়ে তিনি জনগণের আমানত রক্ষায় সচেষ্ট হন। জাগদলের প্রথম আহবায়ক ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার ছিলেন । ১৬ সদস্যের প্রথম আহবায়ক কমিটিতে অন্য যারা মনোনীত হয়েছিলেন তারা হলেন- অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান ,আবদুল মোনেম খান, শামসুল হুদা চৌধুরী, ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হক, এ. জেড. এম. এনায়েতউল্লাহ খান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জাকারিয়া চৌধুরী, এম. আর. খান, ব্যারিস্টার আবুল হাসানাত, এম. এ. হক, ক্যাপ্টেন (অব.) সুজাত আলী, এম. এ. সরকার, আবুল কাশেম, মেজর জেনারেল (অব.) এম. মাজিদ উল হক, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, শামসুল আলম চৌধুরী, এম. হামিদুল্লাহ খান, জাকারিয়া চৌধুরী, অধ্যাপক ড. এম. আর. খান ও সাইফুর রহমান প্রমুখ।
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল—জাগদল গঠনের দিকে তাকালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের কথা ভাবেননি; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বিভিন্ন মত, পেশা, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের মানুষের সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী শক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এখানেই জিয়ার রাজনৈতিক চিন্তার স্বাতন্ত্র‍্য ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার মানুষকে নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী শক্তি তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে অভিজ্ঞ রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতধারার জাতীয়তাবাদী মানুষ একত্রিত হতে পারেন। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে এই ধারণার আরও বিস্তৃত রূপ দেখা যায়। জাগদলকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠিত হয়; সেখানে ন্যাপ (ভাসানী), মুসলিম লীগ, ইউপিপি, লেবার পার্টি ও তফসিলি জাতি ফেডারেশনের বিভিন্ন অংশের নেতারাও যুক্ত হন। অর্থাৎ জাগদল ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নাম নয়; এটি ছিল একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রথম পরীক্ষামূলক ধাপ। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে জাগদল বিলুপ্ত করে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা সেই ধারাবাহিকতারই পরিণতি। পরবর্তীতে জাগদলসহ বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী ও রাজনৈতিক ধারার সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অবশেষে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ ঢাকার রমনা এলাকার খোলা প্রাঙ্গণে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণায় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে দলটির অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল—
 জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা;
 গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা;
 জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি ও আত্মনির্ভরতা অর্জন;
 দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ;
 সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরোধিতা;
 জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নয়ন।
 বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন কাঠামোয় জাতীয় নির্বাহী কমিটি, স্থায়ী কমিটি, পার্লামেন্টারি বোর্ড ও নির্বাচনী কলেজের মতো সাংগঠনিক ব্যবস্থা রাখা হয়।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, জাতীয় স্বনির্ভরতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৩০ এপ্রিল ১৯৭৭ তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচি জাতির সামনে উপস্থাপন করেন। ১৯ দফাকে শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর কেন্দ্রীয় ধারণাগুলো ছিল—স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, আত্মনির্ভরতা, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদ্যনিরাপত্তা, মৌলিক চাহিদা পূরণ, জনগণের অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ। দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের এই মহা কর্মপরিকল্পনাকে দ্রুত আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন, জনগণের অংশগ্রহণ, স্বনির্ভরতা ও গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কর্মসূচিটির ওপর কৃষি, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, বেসরকারি খাতের বিকাশ, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। নিম্নে রাজনৈতিক সচেতন পাঠকদের জ্ঞাতার্থে শহীদ জিয়ার ১৯ দফা:
১) সর্বতোভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
২) শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি—সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সমাজতন্ত্র—জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিফলন করা।
৩) সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলা।
৪) প্রশাসনের সর্বস্তরে, উন্নয়ন কার্যক্রমে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৫) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ তথা জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
৬) দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং কেউ যেন অভুক্ত না থাকে তার ব্যবস্থা করা।
৭) দেশে কাপড়ের উৎপাদন বৃদ্ধি করে সকলের জন্য অন্তত মোটা কাপড় সরবরাহ নিশ্চিত করা।
৮) কোনো নাগরিক যেন গৃহহীন না থাকে, তার যথাসম্ভব ব্যবস্থা করা।
৯) দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা।
১০) সকল দেশবাসীর জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
১১) সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং যুবসমাজকে সুসংহত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।
১২) দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে প্রয়োজনীয় উৎসাহ প্রদান করা।
১৩) শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি এবং উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
১৪) সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোভাব সৃষ্টি করা এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করা।
১৫) জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ করা।
১৬) সকল বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা।
১৭) প্রশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা।
১৮) দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
১৯) ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার পূর্ণভাবে সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করা।
বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ১৯ দফা কর্মসূচি বিশেষভাবে যুক্ত। এর মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্য, উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, কৃষি ও শিল্পের উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, আইনশৃঙ্খলা ও জনগণের জীবনমান উন্নয়ন।
অর্থাৎ বিএনপির প্রতিষ্ঠা শুধু একটি নতুন রাজনৈতিক দল তৈরির ঘটনা ছিল না; এর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শন ও উন্নয়ন-ভাবনাও যুক্ত ছিল। বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাস পরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩০০টির মধ্যে ২০৭টি আসন লাভ করে এবং সরকার গঠন করে। এটি ছিল দলটির প্রতিষ্ঠার পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির দ্রুত উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপি নেতৃত্বের একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। বিচারপতি আবদুস সাত্তার দল ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বে আসেন। পরবর্তীতে সামরিক শাসনবিরোধী দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হন এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ ও ২০০১ সালে বিএনপি আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠণ করে। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গভীর শূন্যতা তৈরি করে। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেননা, কিন্তু বিএনপিকে একটি ব্যাপক জনভিত্তিসম্পন্ন রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, খালেদা জিয়া দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম, নির্বাচন, আন্দোলন ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সেটিকে টিকিয়ে রাখেন এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন—এমন মূল্যায়ন রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। তাঁর মৃত্যু তাই শুধু বিএনপির চেয়ারপারসনের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পরিচিত যুগের অবসান।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে কেবল বিএনপির ইতিহাস দিয়ে বিচার করলে তাঁর ভূমিকার ব্যাপ্তি সম্পূর্ণ বোঝা যাবে না। তিনি বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নেতা, সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময়ের প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদবিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক ছিলেন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার বিরল ভূমিকা, তাঁর মৃত্যু ও রাজনৈতিক শূন্যতা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মানুষের ভূমিকা কেবল একটি দল, একটি নির্বাচন কিংবা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁদের রাজনৈতিক জীবন একটি দীর্ঘ সময়ের জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে মিশে যায়। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর চার দশকের রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ক্ষমতার পালাবদল এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তাঁর মৃত্যু সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি ঘটিয়েছে।
স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীনতার সূচনা: জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে বেগম খালেদা জিয়া সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তখন বাংলাদেশ সামরিক শাসনের অধীনে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিএনপির নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রীতে পরিণত হন। ১৯৮৩ সালে সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি ধারাবাহিকভাবে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যান। আন্দোলনের কারণে তাঁকে একাধিকবার আটক ও গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ক্ষমতাসীন এরশাদ সরকারের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বৈধতা না দেওয়ার সেই অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধানটি আরও দৃঢ় করে। পরবর্তী সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সমন্বিত আন্দোলন ক্রমশ তীব্র হয় এবং ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন ঘটে। এই ইতিহাসের গুরুত্ব এখানেই যে, বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি দলের নেতা হিসেবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি; তিনি দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথের আন্দোলনকে রাজনৈতিক বৈধতা ও সাংগঠনিক শক্তি দিয়েছিলেন।
গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম: এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন এবং সংসদীয় সরকারব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরবর্তী পর্যায়েও তিনি ক্ষমতার রাজনীতির পাশাপাশি বিরোধী দলের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল—ক্ষমতায় থাকুন কিংবা বিরোধী দলে, তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সহজে সরে যাননি। এই কারণেই তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি শুধু বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদবিরোধী রাজনীতির একটি প্রতীক।
২০০৯-এর পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা: ২০০৯ সালের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে বিএনপি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চাপের মধ্যে পড়ে। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা, কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিধিনিষেধ তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বিএনপির বর্ণনায় এই সময়টি ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের নতুন অধ্যায়; সমালোচকেরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাতকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন—দীর্ঘ প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও খালেদা জিয়ার প্রতীকী ভূমিকা: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া শারীরিক অসুস্থতা ও দীর্ঘ বন্দিত্বের কারণে রাজপথে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না। ৭ আগস্ট ২০২৪ রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি মুক্তি পান। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘদিনের আইনি সংকটেরও অবসান ঘটে।
তবু রাজনৈতিক প্রতীকের দিক থেকে তাঁর অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রতীক ছিলেন তিনি। ফলে ২০২৪ সালের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর মুক্তি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর মুক্তি ছিল না; বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের কাছে এটি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি প্রতীকী বিজয়।
তবে ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠে এটিও বলা প্রয়োজন—২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সরাসরি রাজপথের নেতৃত্ব তিনি দেননি। তাঁর অবদানকে বরং দেখতে হবে দীর্ঘ কয়েক দশকের স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদবিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়।
খালেদা জিয়ার বিদায়, তারেক রহমানের নতুন অধ্যায় এবং জুলাইয়ের ঋণ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু বিদায় শুধু একটি দলের জন্য নয়, গোটা রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য একটি যুগের অবসান ঘটায়। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক পথচলায় তিনি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায়, কখনো রাজপথে, কখনো কারাগারে, কখনো কঠিন প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম—তাঁর রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
কিন্তু খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যদি আমরা তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং সেই নেতৃত্বের পথ তৈরিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভূমিকা ভুলে যাই, তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
খালেদা জিয়ার সংগ্রাম থেকে তারেক রহমানের নেতৃত্ব
জিয়াউর রহমান যে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, খালেদা জিয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সেটিকে জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও শক্তিশালী করেন। বিশেষ করে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব তাঁকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখে পরিণত করে।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা, কারাবাস এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও তিনি বিএনপির ঐক্যের প্রধান প্রতীক হিসেবে অবস্থান ধরে রাখেন। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন নতুন প্রজন্মের হাতে। তাঁর মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এই উত্তরাধিকার কে ধারণ করবেন এবং কোন রাজনৈতিক দর্শনে এগিয়ে নেবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রসঙ্গ সামনে আসে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শুধু পারিবারিক উত্তরাধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। তাঁর নেতৃত্বের সামনে যে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট মৌলিক রাজনৈতিক পরিবর্তন।
জুলাই—শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে যদি কেবল একটি সরকারের পতনের ঘটনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অত্যন্ত সংকীর্ণ করে দেখা হবে। জুলাইয়ের রাজপথে ছাত্র-যুবকদের যে আত্মত্যাগ, তা ছিল একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল যেখানে নাগরিকের মর্যাদা থাকবে, বৈষম্য কমবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহির মধ্যে থাকবে এবং ক্ষমতা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ অসংখ্য পরিচিত ও অপরিচিত তরুণ সেই আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন। কেউ হয়তো ইতিহাসের পাতায় নাম পেয়েছেন, অনেকেই পাননি। কিন্তু তাঁদের রক্তে লেখা সেই ইতিহাসকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক সুবিধার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। জুলাইয়ের আত্মত্যাগ কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের জনগণের একটি বৃহত্তর গণআকাক্সক্ষার অংশ।
তারেক রহমানের পথ এবং জুলাইয়ের দায়
আজ যদি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবে তাঁর রাজনৈতিক পথের ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ রাজনীতিতে ক্ষমতার সুযোগ তৈরি হয় ইতিহাসের নির্দিষ্ট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। জুলাই সেই পরিবর্তনের একটি প্রধান বাঁক। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধিতা, আন্দোলন এবং জনঅসন্তোষ যখন ছাত্র-যুবকদের নেতৃত্বে বিস্ফোরিত গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়, তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার আমূল পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতাই নতুন নেতৃত্বের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থানকে যদি একটি ধারাবাহিকতার মধ্যে দেখতে হয়, তাহলে সেখানে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ—তিনটিকেই যথাযথ জায়গা দিতে হবে। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়।

*লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজকর্মী

আরো