উপজেলায় ‘কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র’: উপজেলা অফিসের ছাতার নিচে এক প্ল্যাটফর্মে চাকরি, প্রশিক্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা ও শিল্পের সংযোগ

তরুণদের জন্য তৈরি হতে পারে একটি জাতীয় কর্মসংস্থান নেটওয়ার্ক

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে পারে যুক্তরাজ্যের Jobcentre Plus-এর আদলে বাংলাদেশের নিজস্ব ‘Employment Exchange Centre’—কম খরচে, বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে তরুণদের জন্য তৈরি হতে পারে একটি জাতীয় কর্মসংস্থান নেটওয়ার্ক

বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনশক্তিকে দেশের অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে হলে শুধু শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষা, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, চাকরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বেসরকারি শ্রমবাজারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। বর্তমানে এসব সেবা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সমন্বয় নেই। ফলে একজন চাকরিপ্রার্থীকে একই তথ্যের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানে যেতে হয় এবং নিয়োগদাতারাও উপযুক্ত কর্মী খুঁজতে সময় ও অর্থ ব্যয় করেন।

সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে দেশের প্রতিটি জেলায় ‘Employment Exchange Centre’ প্রতিষ্ঠার যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে, আমি মনে করি সেটিকে আরও জনগণমুখী ও কার্যকর করতে প্রতিটি উপজেলায় একটি সমন্বিত ‘কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। নতুন করে ব্যয়বহুল অফিস ভবন নির্মাণের পরিবর্তে এই কেন্দ্রগুলো উপজেলা অফিসের বিদ্যমান অবকাঠামোর ছাতার নিচে স্থাপন করা সম্ভব। এতে একই সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে এবং প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও সরাসরি সেবা পাবেন।

যুক্তরাজ্যে Department for Work and Pensions (DWP)-এর Jobcentre Plus কর্মপ্রার্থী মানুষের চাকরি খোঁজা, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এর অনুকরণ নয়, বরং বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি নিজস্ব মডেল তৈরি করা যেতে পারে।

এক ছাতার নিচে সরকারি-বেসরকারি সব অংশীদার

প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের বিচ্ছিন্ন অফিস না হয়ে হবে একটি সমন্বিত One-Stop Employment Service Centre। এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর—বিশেষ করে সমাজসেবা অধিদপ্তর, শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা।

একই সঙ্গে অংশীদার করা হবে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, এনজিও, স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারকে।

একজন শিক্ষার্থী বা চাকরিপ্রার্থী এই কেন্দ্রে এসে জানতে পারবেন—তার যোগ্যতা অনুযায়ী কোথায় চাকরি আছে, কোন প্রশিক্ষণ তার জন্য উপযোগী, কোন প্রতিষ্ঠানে apprenticeship-এর সুযোগ রয়েছে এবং কীভাবে তিনি নিজের দক্ষতা উন্নত করতে পারেন।

চাকরি খোঁজা থেকে কর্মজীবন—একটি পূর্ণাঙ্গ সহায়তা ব্যবস্থা

কেন্দ্রে Work Coach, Employer Adviser এবং Recruitment Specialist-এর মতো দায়িত্বে দক্ষ জনবল রাখা যেতে পারে। Work Coach চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে আলোচনা করে তার ক্যারিয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা চিহ্নিতকরণ এবং চাকরি খোঁজার পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করবেন।

Employer Adviser স্থানীয় ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কর্মী চাহিদা সংগ্রহ করবেন। Recruitment Specialist নিয়োগদাতা ও চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন, CV বাছাই, সাক্ষাৎকার আয়োজন এবং নিয়োগপ্রক্রিয়াকে সহজ করতে সহযোগিতা করবেন।

এর ফলে স্থানীয় ব্যবসাগুলোও সরাসরি উপকৃত হবে। চাকরির বিজ্ঞাপন, প্রাথমিক বাছাই, সাক্ষাৎকার আয়োজন এবং নতুন কর্মীর প্রাথমিক প্রশিক্ষণের ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বিদ্যমান কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে একই নেটওয়ার্কে আনা

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বহু কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। নতুন করে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তৈরির পরিবর্তে প্রস্তাবিত কেন্দ্রগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়, তথ্য বিনিময় ও কর্মসংস্থানের সংযোগকারী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।

যে অঞ্চলে যে ধরনের শিল্পের চাহিদা বেশি, সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করা হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের apprenticeship-এর আদলে শিক্ষা ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকে একত্রিত করে শিক্ষানবিশ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এতে তরুণরা শুধু সার্টিফিকেট নয়, বাস্তব কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।

NBR-এর জন্যও তৈরি হবে ভবিষ্যৎ করদাতাদের তথ্যভান্ডার

এই ব্যবস্থার একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধাও রয়েছে। আইন ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রেখে কর্মসংস্থানপ্রাপ্ত মানুষের একটি স্বচ্ছ ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে NBR সম্ভাব্য নতুন করদাতাদের একটি কাঠামোবদ্ধ তালিকা পেতে পারে। এর ফলে করজাল সম্প্রসারণ, কর-সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করা সহজ হবে।

কম খরচে—Shared Desk ও Rota System

প্রতিটি অফিসে প্রতিটি কর্মকর্তার জন্য আলাদা স্থায়ী ডেস্কের প্রয়োজন নেই। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে Birmingham City Council-এ ব্যবহৃত shared workstation ও rota system-এর অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে একটি কম্পিউটার, নিরাপদ ব্যক্তিগত লগইন ও নির্ধারিত সময়সূচির মাধ্যমে একাধিক কর্মকর্তা একই কর্মস্থল ব্যবহার করতে পারেন। এতে অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

প্রাথমিক পর্যায়ে দক্ষ ও যোগ্য জনবলকে চুক্তিভিত্তিক বা অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। কর্মদক্ষতা, সততা ও ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তীতে স্থায়ী নিয়োগের সুযোগ রাখা যেতে পারে। এখানে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

পাইলট প্রকল্প দিয়ে শুরু হতে পারে যাত্রা

আমার প্রস্তাব হলো, প্রথমে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে নির্বাচিত কয়েকটি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। সাফল্য, ব্যয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রশিক্ষণের ফলাফল এবং জনগণের সন্তুষ্টি মূল্যায়ন করে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় এটি সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেকারের সংখ্যা কমানো নয়; বরং প্রতিটি তরুণের শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের একটি বাস্তব সেতুবন্ধন তৈরি করা।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ যদি উপজেলা পর্যায়ে এই সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি চাকরি খোঁজার কেন্দ্র হবে না—বরং শিক্ষা, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা, শিল্প, ব্যবসা, করব্যবস্থা ও স্থানীয় অর্থনীতিকে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার একটি আধুনিক জাতীয় কর্মসংস্থান ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা সময়ের দাবি। কারণ যোগ্যতা যদি চাকরির সঙ্গে, প্রশিক্ষণ যদি শিল্পের চাহিদার সঙ্গে এবং তরুণ প্রজন্ম যদি দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারে—তবেই জনসংখ্যার বিশাল শক্তি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হবে।

লেখক:
ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন MBE
মানবাধিকার সংগঠক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
সাবেক স্থানীয় সরকার কর্মকর্তা, যুক্তরাজ্য
চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল
বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য.

আরো